জাহিদ হাসান সিরাজগঞ্জের সন্তান, নাটক ও চলচ্চিত্রের অনন্য অভিনেতা

রেজওয়ান
  • আপডেট সময় : ০৪:০৪:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ৯৪৯ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সিরাজগঞ্জ এর সর্বশেষ ও জনপ্রিয় লেখা অনুসরণ করতে গুগল নিউজফিড দেখুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের নাটি–মাটি–মানুষের গল্পে যিনি নিজেকে মিশিয়ে দিতে পেরেছেন স্বাভাবিক অভিনয়, সাবলীল অভিব্যক্তি ও বহুমাত্রিক চরিত্রচিত্রণে— তিনি জাহিদ হাসান। ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দা, কমেডি থেকে গভীর জীবনঘনিষ্ঠ চরিত্র— সবখানেই তিনি সমানভাবে সফল। নব্বইয়ের দশক থেকে আজ পর্যন্ত তিনি দেশের প্রথম সারির অভিনেতাদের একজন হিসেবে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

 

১৯৬৭ সালের ৪ অক্টোবর সিরাজগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন জাহিদ হাসান। মধ্যবিত্ত এক পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। ছোটবেলা থেকেই তার জীবনজুড়ে ছিল শৃঙ্খলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার প্রভাব।

বেহুলার স্মৃতি ঘেরা তাড়াশ হতে পারে ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র

স্কুলজীবনে তিনি স্কাউটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখানেই প্রথম মঞ্চে অভিনয়ের সুযোগ পান এবং ধীরে ধীরে অভিনয়ের প্রতি তার গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়। এই আগ্রহ থেকেই তিনি যোগ দেন সিরাজগঞ্জ তরুণ সম্প্রদায় নাট্য দল-এ। দলের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত মঞ্চনাটকে অভিনয় করতেন তিনি। বিশেষ করে ‘সাত পুরুষের ঋণ’ মঞ্চনাটকে তার অভিনয় ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৪ সালের ১০ আগস্ট নাটকটি বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হলে তার অভিনয়জীবনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

 

১৯৮৬ সালে আবদুল লতিফ বাচ্চু পরিচালিত বাংলাদেশ–পাকিস্তান–শ্রীলঙ্কার যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র ‘বলবান’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় তার অভিষেক ঘটে। এরপর ১৯৯০ সালে তিনি নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকে অভিনয় শুরু করেন। তখন থেকে আজ পর্যন্ত বিরামহীনভাবে অভিনয় করে যাচ্ছেন তিনি, উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় নাটক।

 

জাহিদ হাসানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো— যেকোনো চরিত্রে সহজেই মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। কমেডি চরিত্রে তিনি অনন্য। মফিজ পাগলা ও আরমান ভাই চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকের কাছে আজও জনপ্রিয় ও স্মরণীয়। হাস্যরসের আড়ালেও তিনি চরিত্রের গভীরতা ও মানবিক দিক সুন্দরভাবে তুলে ধরতে পারেন।

 

চলচ্চিত্রেও জাহিদ হাসান নিজেকে প্রমাণ করেছেন একজন শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে। তার অভিনীত শ্রাবণ মেঘের দিন, মেড ইন বাংলাদেশ, ঝন্টু মন্টু দুই ভাই, আমার আছে জল, প্রজাপতি এবং হালদা চলচ্চিত্রগুলো দর্শক ও সমালোচকদের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। বিশেষ করে হালদা চলচ্চিত্রে তার অভিনয় আবারও প্রমাণ করে— ভালো চরিত্র পেলে তিনি এখনো সমান দক্ষতায় নিজেকে মেলে ধরতে পারেন।

 

অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি নাটক পরিচালনাতেও সমানভাবে সফল। লাল নীল বেগুনি, ঘুঘুর বাসা, চোর কুটুরি, একা, ছন্নছাড়া, রুমঝুম, বোকা মানুষ, ব্যবধান, স্বপ্নের গ্রহ, অপু দ্য গ্রেট, প্রাইভেট ডিটেকটিভ ও বাউন্ডুলে এক্সপ্রেস— এসব নাটক পরিচালনার মাধ্যমে একজন দক্ষ নির্মাতা হিসেবেও তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।

 

ব্যক্তিগত জীবনে জাহিদ হাসান সুখী দাম্পত্য জীবনের অধিকারী। তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন দেশের জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেত্রী সাদিয়া ইসলাম মৌ-এর সঙ্গে। তাদের সংসারে রয়েছে দুই সন্তান— কন্যা পুস্পিতা এবং পুত্র পূর্ণ।

 

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি কাজের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে এনেছেন। বর্তমানে ঈদের বিশেষ নাটক ছাড়া নিয়মিত তাকে পর্দায় দেখা যায় না। তবে ঈদের নাটকগুলোতেই থাকে জাহিদ হাসানের উপস্থিতি ও দর্শকের প্রধান আকর্ষণ। ভালো ও অর্থবহ চরিত্র পেলে তিনি এখনো অভিনয়ে ফেরেন— যার প্রমাণ হালদা চলচ্চিত্র।

 

বর্তমানে তিনি ‘পুস্পিতা প্রডাকশন লিমিটেড’ নামে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে সময় দিচ্ছেন নির্মাণ ও পরিকল্পনায়।

বাংলা চলচ্চিত্রের মেগাস্টার উজ্জ্বল

দীর্ঘ অভিনয় জীবনে জাহিদ হাসান অর্জন করেছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। নাট্যাঙ্গনে তাকে দেশের সেরা অভিনেতাদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেকের মতে, অভিনয়ের ভারসাম্য, চরিত্রের গভীরতা ও গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে তার সমপর্যায়ের অভিনেতা দেশে খুব কমই আছে।

 

সিরাজগঞ্জের এই কৃতী সন্তান আজও বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রের এক নির্ভরতার নাম— জাহিদ হাসান।

লেখাটি শেয়ার করুন

জাহিদ হাসান সিরাজগঞ্জের সন্তান, নাটক ও চলচ্চিত্রের অনন্য অভিনেতা

আপডেট সময় : ০৪:০৪:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের নাটি–মাটি–মানুষের গল্পে যিনি নিজেকে মিশিয়ে দিতে পেরেছেন স্বাভাবিক অভিনয়, সাবলীল অভিব্যক্তি ও বহুমাত্রিক চরিত্রচিত্রণে— তিনি জাহিদ হাসান। ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দা, কমেডি থেকে গভীর জীবনঘনিষ্ঠ চরিত্র— সবখানেই তিনি সমানভাবে সফল। নব্বইয়ের দশক থেকে আজ পর্যন্ত তিনি দেশের প্রথম সারির অভিনেতাদের একজন হিসেবে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

 

১৯৬৭ সালের ৪ অক্টোবর সিরাজগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন জাহিদ হাসান। মধ্যবিত্ত এক পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। ছোটবেলা থেকেই তার জীবনজুড়ে ছিল শৃঙ্খলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার প্রভাব।

বেহুলার স্মৃতি ঘেরা তাড়াশ হতে পারে ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র

স্কুলজীবনে তিনি স্কাউটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখানেই প্রথম মঞ্চে অভিনয়ের সুযোগ পান এবং ধীরে ধীরে অভিনয়ের প্রতি তার গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়। এই আগ্রহ থেকেই তিনি যোগ দেন সিরাজগঞ্জ তরুণ সম্প্রদায় নাট্য দল-এ। দলের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত মঞ্চনাটকে অভিনয় করতেন তিনি। বিশেষ করে ‘সাত পুরুষের ঋণ’ মঞ্চনাটকে তার অভিনয় ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৪ সালের ১০ আগস্ট নাটকটি বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হলে তার অভিনয়জীবনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

 

১৯৮৬ সালে আবদুল লতিফ বাচ্চু পরিচালিত বাংলাদেশ–পাকিস্তান–শ্রীলঙ্কার যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র ‘বলবান’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় তার অভিষেক ঘটে। এরপর ১৯৯০ সালে তিনি নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকে অভিনয় শুরু করেন। তখন থেকে আজ পর্যন্ত বিরামহীনভাবে অভিনয় করে যাচ্ছেন তিনি, উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় নাটক।

 

জাহিদ হাসানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো— যেকোনো চরিত্রে সহজেই মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। কমেডি চরিত্রে তিনি অনন্য। মফিজ পাগলা ও আরমান ভাই চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকের কাছে আজও জনপ্রিয় ও স্মরণীয়। হাস্যরসের আড়ালেও তিনি চরিত্রের গভীরতা ও মানবিক দিক সুন্দরভাবে তুলে ধরতে পারেন।

 

চলচ্চিত্রেও জাহিদ হাসান নিজেকে প্রমাণ করেছেন একজন শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে। তার অভিনীত শ্রাবণ মেঘের দিন, মেড ইন বাংলাদেশ, ঝন্টু মন্টু দুই ভাই, আমার আছে জল, প্রজাপতি এবং হালদা চলচ্চিত্রগুলো দর্শক ও সমালোচকদের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। বিশেষ করে হালদা চলচ্চিত্রে তার অভিনয় আবারও প্রমাণ করে— ভালো চরিত্র পেলে তিনি এখনো সমান দক্ষতায় নিজেকে মেলে ধরতে পারেন।

 

অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি নাটক পরিচালনাতেও সমানভাবে সফল। লাল নীল বেগুনি, ঘুঘুর বাসা, চোর কুটুরি, একা, ছন্নছাড়া, রুমঝুম, বোকা মানুষ, ব্যবধান, স্বপ্নের গ্রহ, অপু দ্য গ্রেট, প্রাইভেট ডিটেকটিভ ও বাউন্ডুলে এক্সপ্রেস— এসব নাটক পরিচালনার মাধ্যমে একজন দক্ষ নির্মাতা হিসেবেও তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।

 

ব্যক্তিগত জীবনে জাহিদ হাসান সুখী দাম্পত্য জীবনের অধিকারী। তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন দেশের জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেত্রী সাদিয়া ইসলাম মৌ-এর সঙ্গে। তাদের সংসারে রয়েছে দুই সন্তান— কন্যা পুস্পিতা এবং পুত্র পূর্ণ।

 

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি কাজের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে এনেছেন। বর্তমানে ঈদের বিশেষ নাটক ছাড়া নিয়মিত তাকে পর্দায় দেখা যায় না। তবে ঈদের নাটকগুলোতেই থাকে জাহিদ হাসানের উপস্থিতি ও দর্শকের প্রধান আকর্ষণ। ভালো ও অর্থবহ চরিত্র পেলে তিনি এখনো অভিনয়ে ফেরেন— যার প্রমাণ হালদা চলচ্চিত্র।

 

বর্তমানে তিনি ‘পুস্পিতা প্রডাকশন লিমিটেড’ নামে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে সময় দিচ্ছেন নির্মাণ ও পরিকল্পনায়।

বাংলা চলচ্চিত্রের মেগাস্টার উজ্জ্বল

দীর্ঘ অভিনয় জীবনে জাহিদ হাসান অর্জন করেছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। নাট্যাঙ্গনে তাকে দেশের সেরা অভিনেতাদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেকের মতে, অভিনয়ের ভারসাম্য, চরিত্রের গভীরতা ও গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে তার সমপর্যায়ের অভিনেতা দেশে খুব কমই আছে।

 

সিরাজগঞ্জের এই কৃতী সন্তান আজও বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রের এক নির্ভরতার নাম— জাহিদ হাসান।