বেহুলার স্মৃতি ঘেরা তাড়াশ হতে পারে ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র

রেজওয়ান
  • আপডেট সময় : ০৪:৫৬:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ১০৫৬ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সিরাজগঞ্জ এর সর্বশেষ ও জনপ্রিয় লেখা অনুসরণ করতে গুগল নিউজফিড দেখুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

কিংবদন্তির নায়িকা, বিশ্বনন্দিত সতী-সাবিত্রী রূপে পরিচিত বেহুলা সুন্দরীর স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা ও স্থানগুলোকে ঘিরে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা গড়ে উঠতে পারে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র। ষোড়শ শতাব্দীর প্রাচীন এই জনপ্রিয় লোককাহিনীর নায়িকা বেহুলা সুন্দরীর জন্মস্থান ছিল তৎকালীন নিচানীনগর, বর্তমান বিনসাড়া গ্রাম। তিনি ছিলেন বাছোবানিয়ার একমাত্র রূপসীকন্যা—রূপে, গুণে ও সাহসে অনন্য।

 

জনশ্রুতি অনুযায়ী, বেহুলা সুন্দরী নিয়মিতই বাবা বাছোবানিয়ার সঙ্গে বাজারে যেতেন। যে বাজারে তিনি যেতেন, সেটিই আজকের চান্দের বাজার। প্রায় ৩ শত বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত এই বাজার একসময় ছিল তাড়াশ অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র। অপরদিকে বগুড়ার মহাস্থানগড় সংলগ্ন গোকুল গ্রাম থেকে বিখ্যাত ব্যবসায়ী চাঁদ সওদাগর (চান্দু সওদাগর) তার পুত্র লক্ষ্মীন্দরকে সঙ্গে করে নিয়মিত চান্দের বাজারে আসতেন।

 

আরো পড়ুন:হুরাসাগরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাস — মাটি বেহাল এক রহস্যময় কূপ

এই বাজারেই প্রথমবার মুখোমুখি হয় বেহুলা ও লক্ষ্মীন্দরের। প্রথম দেখাতেই দু’জনের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর প্রেমের সম্পর্ক। যে বিশাল বটগাছের নিচে বসে তারা গল্প করতেন, সেই বটগাছটি আজও প্রায় ৫ বিঘা জায়গা জুড়ে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান সময়ে চান্দের বাজার এলাকায় গড়ে উঠেছে স্কুল, কলেজ ও ভূমি অফিস।

 

তাড়াশ উপজেলায় প্রায় ৭ শত বিঘা খাস জমি রয়েছে। তবে দুঃখজনকভাবে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী ব্যক্তি এসব খাস জমি দখল করে রেখেছে। কোথাও জাল কাগজ তৈরি করে নিজের নামে দখল নিয়েছে, কোথাও আবার বসতঘর নির্মাণ করে বসবাস করছে। সরকারিভাবে এসব খাস জমি লিজ দেওয়া হলে প্রতিবছর সরকারের লাখ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হতো।

 

একসময় চান্দের মেলায় প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সমবেত হতো। বটগাছের মাঝখানে অবস্থিত শিবমন্দিরে মানত করে পূজা দিত ভক্তরা। প্রায় ৮০ ফুট উচ্চতার এই বটগাছটির চারপাশে রয়েছে প্রায় ৫৬০টি ঝুলন্ত বর, যা বেহুলা ও লক্ষ্মীন্দরের বসার স্থানকে ঘিরে রেখেছে। বরগুলো দেখতে অপূর্ব হলেও বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় দর্শনার্থীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। এরই মধ্যে প্রভাবশালীদের হাতে কিছু বর কেটে নষ্ট হয়ে গেছে। সরকারি তত্ত্বাবধানের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে চান্দের মেলার ঐতিহ্য।

 

দূর থেকেই এখনও চোখে পড়ে এই ঐতিহাসিক বটগাছটি। এর পাশাপাশি বিনসাড়া গ্রামে অবস্থিত বেহুলার স্মৃতিজড়ানো জিয়ন কূপ আজও কালের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। জিয়ন কূপের বিশেষত্ব হলো—একটির ভেতর চারটি কূপের অস্তিত্ব, যা দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। প্রতিদিন শত শত মানুষ এই কূপ দেখতে বিনসাড়া গ্রামে আসেন।

 

প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসে, চাঁদের ২ তারিখ থেকে ২৪ তারিখের মধ্যে তিন দিনব্যাপী জিয়ন কূপকেন্দ্রিক চান্দের মেলা বসে। ভক্ত ও দর্শনার্থীরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে দুধ, কলা ও নানা মানত অর্পণ করেন।

 

আরো পড়ুন: সিরাজগঞ্জ জেলার নামকরণ ও প্রশাসনিক ইতিহাস

দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী চান্দের বাজার ও জিয়ন কূপকে ঘিরে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছেন। যথাযথ পরিকল্পনা ও সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হলে, বেহুলার স্মৃতিবিজড়িত তাড়াশ শুধু ইতিহাসের অংশ নয়—দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে হয়ে উঠতে পারে এক আকর্ষণীয় ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন গন্তব্য।

লেখাটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

বেহুলার স্মৃতি ঘেরা তাড়াশ হতে পারে ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র

আপডেট সময় : ০৪:৫৬:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫

 

কিংবদন্তির নায়িকা, বিশ্বনন্দিত সতী-সাবিত্রী রূপে পরিচিত বেহুলা সুন্দরীর স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা ও স্থানগুলোকে ঘিরে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা গড়ে উঠতে পারে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র। ষোড়শ শতাব্দীর প্রাচীন এই জনপ্রিয় লোককাহিনীর নায়িকা বেহুলা সুন্দরীর জন্মস্থান ছিল তৎকালীন নিচানীনগর, বর্তমান বিনসাড়া গ্রাম। তিনি ছিলেন বাছোবানিয়ার একমাত্র রূপসীকন্যা—রূপে, গুণে ও সাহসে অনন্য।

 

জনশ্রুতি অনুযায়ী, বেহুলা সুন্দরী নিয়মিতই বাবা বাছোবানিয়ার সঙ্গে বাজারে যেতেন। যে বাজারে তিনি যেতেন, সেটিই আজকের চান্দের বাজার। প্রায় ৩ শত বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত এই বাজার একসময় ছিল তাড়াশ অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র। অপরদিকে বগুড়ার মহাস্থানগড় সংলগ্ন গোকুল গ্রাম থেকে বিখ্যাত ব্যবসায়ী চাঁদ সওদাগর (চান্দু সওদাগর) তার পুত্র লক্ষ্মীন্দরকে সঙ্গে করে নিয়মিত চান্দের বাজারে আসতেন।

 

আরো পড়ুন:হুরাসাগরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাস — মাটি বেহাল এক রহস্যময় কূপ

এই বাজারেই প্রথমবার মুখোমুখি হয় বেহুলা ও লক্ষ্মীন্দরের। প্রথম দেখাতেই দু’জনের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর প্রেমের সম্পর্ক। যে বিশাল বটগাছের নিচে বসে তারা গল্প করতেন, সেই বটগাছটি আজও প্রায় ৫ বিঘা জায়গা জুড়ে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান সময়ে চান্দের বাজার এলাকায় গড়ে উঠেছে স্কুল, কলেজ ও ভূমি অফিস।

 

তাড়াশ উপজেলায় প্রায় ৭ শত বিঘা খাস জমি রয়েছে। তবে দুঃখজনকভাবে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী ব্যক্তি এসব খাস জমি দখল করে রেখেছে। কোথাও জাল কাগজ তৈরি করে নিজের নামে দখল নিয়েছে, কোথাও আবার বসতঘর নির্মাণ করে বসবাস করছে। সরকারিভাবে এসব খাস জমি লিজ দেওয়া হলে প্রতিবছর সরকারের লাখ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হতো।

 

একসময় চান্দের মেলায় প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সমবেত হতো। বটগাছের মাঝখানে অবস্থিত শিবমন্দিরে মানত করে পূজা দিত ভক্তরা। প্রায় ৮০ ফুট উচ্চতার এই বটগাছটির চারপাশে রয়েছে প্রায় ৫৬০টি ঝুলন্ত বর, যা বেহুলা ও লক্ষ্মীন্দরের বসার স্থানকে ঘিরে রেখেছে। বরগুলো দেখতে অপূর্ব হলেও বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় দর্শনার্থীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। এরই মধ্যে প্রভাবশালীদের হাতে কিছু বর কেটে নষ্ট হয়ে গেছে। সরকারি তত্ত্বাবধানের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে চান্দের মেলার ঐতিহ্য।

 

দূর থেকেই এখনও চোখে পড়ে এই ঐতিহাসিক বটগাছটি। এর পাশাপাশি বিনসাড়া গ্রামে অবস্থিত বেহুলার স্মৃতিজড়ানো জিয়ন কূপ আজও কালের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। জিয়ন কূপের বিশেষত্ব হলো—একটির ভেতর চারটি কূপের অস্তিত্ব, যা দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। প্রতিদিন শত শত মানুষ এই কূপ দেখতে বিনসাড়া গ্রামে আসেন।

 

প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসে, চাঁদের ২ তারিখ থেকে ২৪ তারিখের মধ্যে তিন দিনব্যাপী জিয়ন কূপকেন্দ্রিক চান্দের মেলা বসে। ভক্ত ও দর্শনার্থীরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে দুধ, কলা ও নানা মানত অর্পণ করেন।

 

আরো পড়ুন: সিরাজগঞ্জ জেলার নামকরণ ও প্রশাসনিক ইতিহাস

দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী চান্দের বাজার ও জিয়ন কূপকে ঘিরে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছেন। যথাযথ পরিকল্পনা ও সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হলে, বেহুলার স্মৃতিবিজড়িত তাড়াশ শুধু ইতিহাসের অংশ নয়—দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে হয়ে উঠতে পারে এক আকর্ষণীয় ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন গন্তব্য।