সুতোর টানে ফুটে ওঠে ফুল! ঈদের আনন্দে মাতোয়ারা সিরাজগঞ্জের গ্রামে গ্রামে চলছে ঐতিহ্যবাহী ‘ফুল পিঠা’ তৈরির মহোৎসব
সিরিঞ্জের ছোঁয়ায় সুতোর টানে: সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ফুল পিঠা
- আপডেট সময় : ০৪:৫২:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬
- / ৬৬৯ বার পড়া হয়েছে
ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ আর শেকড়ের টানে আপন নীড়ে ফেরা। আর এই উৎসবকে আরও রঙিন, সুস্বাদু ও চিরচেনা রূপ দিতে সিরাজগঞ্জ জেলার প্রতিটি গ্রামে এখন চলছে সাজ সাজ রব। ঈদের আনন্দকে আপনজনের সাথে ভাগ করে নিতে সিরাজগঞ্জের গৃহিণীরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলার নিজস্ব, ঐতিহ্যবাহী ও অত্যন্ত সুনিপুণ লোকজ শিল্প ‘ফুল পিঠা’ তৈরিতে।
যান্ত্রিক শহরের কৃত্রিমতা থেকে দূরে, সিরাজগঞ্জের গ্রামগুলোতে কান পাতলেই এখন শোনা যায় ঢেঁকিতে চাল কোটার শব্দ আর চোখে পড়ে উঠোনে উঠোনে নারীদের দল বেঁধে পিঠা তৈরির অপূর্ব দৃশ্য। amadersirajganjbd.com-এর পাঠকদের জন্য আজ তুলে ধরা হলো আমাদের সিরাজগঞ্জের এই হারিয়ে যেতে বসা অথচ জাদুকরী এক ঐতিহ্যের গল্প।
কলাপাতা যখন শিল্পীর ক্যানভাস
ছবিটি দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে নিপুণ কোনো শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা নিখুঁত কোনো আল্পনা। কিন্তু না, এটি কোনো সাধারণ রঙ-তুলির আঁচড় নয়। এই পিঠা তৈরির ক্যানভাস হলো গ্রামবাংলার সতেজ সবুজ কলাপাতা। কলাপাতার ওপর পিঠাগুলো রাখলে তা দেখতে যেমন সতেজ লাগে, তেমনি পিঠার নিচটাও থাকে একদম মসৃণ। সবুজ পাতার বুকে সাদা আর বেগুনি রঙের এই পিঠাগুলো যেন প্রকৃতিরই এক অপূর্ব ক্যানভাস।

ইনজেকশনের সিরিঞ্জ যখন জাদুর কাঠি!
এই ফুল পিঠা তৈরির সবচেয়ে বিস্ময়কর ও চমকপ্রদ দিকটি হলো এর নকশা করার পদ্ধতি। আধুনিক যুগের দামি কোনো ডাইস, নজেল বা পাইপিং ব্যাগ নয়; সিরাজগঞ্জের গ্রামীণ নারীরা তাদের উদ্ভাবনী চিন্তায় নকশা তোলার হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন নিতান্তই সাধারণ একটি জিনিস—নতুন ‘ইনজেকশনের সিরিঞ্জ’।
চালের মিহি গুঁড়ো দিয়ে যত্ন করে তৈরি করা হয় নরম খামির। এরপর সেই খামির ভরা হয় সিরিঞ্জের ভেতরে। হাতের আলতো ও সুনিপুণ চাপে সিরিঞ্জের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে সুতোর মতো চিকন খামিরের ধারা। আর পাতার ওপর সেই সুতো চক্রাকারে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নারীরা তাদের মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করেন এক একটি দৃষ্টিনন্দন ফুল। একেকটি পিঠা যেন একেকজন গৃহিণীর শৈল্পিক মনের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।
রঙের বাহার আর স্বাদের জাদু
ফুল পিঠার মূল ভিত্তি চালের গুঁড়া হলেও, একে আকর্ষণীয় করে তুলতে খামিরের সাথে মেশানো হয় বাহারি ফুড কালার বা খাবার রঙ। ছবিতে যেমনটা দেখা যাচ্ছে—শুভ্র স্নিগ্ধ সাদার পাশাপাশি মনকাড়া হালকা বেগুনি বা গোলাপি রঙের আভা।

পিঠাগুলো তৈরি করার পর কড়া রোদে শুকিয়ে সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়। এরপর ঈদের দিন সকালে বা বিকেলে মেহমান এলেই ডুবো তেলে ভেজে পরিবেশন করা হয়। গরম তেলে ভাজার পর এই ফুল পিঠাগুলো যেন আক্ষরিক অর্থেই পাপড়ি মেলে ফুটে ওঠে। দেখতে যেমন নজরকাড়া, মচমচে এই পিঠার স্বাদও তেমনি অতুলনীয়।

ঐতিহ্যের শেকড় ধরে রাখা
আধুনিকতার এই যুগে, যখন ফাস্টফুড আর বেকারির খাবারে বাজার সয়লাব, তখন সিরাজগঞ্জের এই ঐতিহ্যবাহী ফুল পিঠা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের শেকড়ের কথা। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া ছাড়াই কেবল হাতের জাদু আর অপরিসীম ধৈর্যে তৈরি এই পিঠা গ্রামীণ নারীদের এক অনন্য শিল্পকর্ম। ঈদের আগে বাড়ির উঠোনে বা বারান্দায় পাটি বিছিয়ে, গল্প-গুজবের ফাঁকে ফাঁকে নারীদের এই পিঠা তৈরির দৃশ্য যেন আবহমান বাংলার গ্রামীণ সম্প্রীতি ও ভালোবাসার এক জীবন্ত উদাহরণ।
আসুন, আমাদের জেলার এই নিজস্ব ঐতিহ্যকে আমরা আরও বেশি করে তুলে ধরি। যারা এত মমতা দিয়ে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, amadersirajganjbd.com-এর পক্ষ থেকে সিরাজগঞ্জের সেইসব নিভৃতচারী লোকজ শিল্পীদের জানাই সশ্রদ্ধ সালাম।
আপনি চাইলে আমাদের সাইটে আপনার লেখা বিভিন্ন প্রতিবেদন, গল্প, কবিতা, মজার ও দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে লিখে প্রকাশ করতে পারেন। আপনার লেখা প্রকাশ করতে ভিজিট করুন-














