ভাষা আন্দোলনে সিরাজগঞ্জ জেলার ইতিহাস

লেখকের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:২৯:৪৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ৭৫৩ বার পড়া হয়েছে

১৯৭০ সা‌লে ২১ ফেব্রুয়ারী সিরাজগঞ্জ শহ‌রের ই‌লিয়ট ব্রি‌জের কা‌ছে লক্ষী সি‌নেমা হ‌লের সাম‌নে অবস্থিত সিরাজগঞ্জ জেলার প্রথম শহীদ মিনার

আমাদের সিরাজগঞ্জ এর সর্বশেষ ও জনপ্রিয় লেখা অনুসরণ করতে গুগল নিউজফিড দেখুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
১৯৪৮ সালে সিরাজগঞ্জে ভাষা আন্দোলন সংগঠিত করেন তিন বন্ধু। সাইফুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম ও মির আবুল হোসেন। “লড়কে লেয়েঙ্গে পাকিস্তান- ছিনকে লেয়েঙ্গে পাকিস্তান। হাতমে বিড়ি, মুখে পান, লড়কে লেয়েঙ্গা পাকিস্তান”- ভ্রান্তির শ্লোগানে উদ্বুদ্ধ হয়ে পাকিস্তান কায়েমের মুরুব্বিদের অসহযোগিতায় ‘৪৮-এর পর আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু এতে করেও থেমে থাকেনি সিরাজগঞ্জের ভাষা সৈনিকরা।
‘৪৮-এর পর উর্দু সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা পরিচালনা করে বাংলা ভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। ৫০ সালের পর আন্দোলনে মাত্রা বাড়তে থাকে। ৫২ সালে সেই আন্দোলন নতুন করে বেগবান হয়। ইতোমধ্যে ৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বের তিন তরুণের একজন মির আবুল হোসেন চলে যান গ্রামের বাড়ি। নজরুল ইসলাম চলে যান অন্য শহর। এসময় পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে ম্যাট্রিক পাস করে আনোয়ার হোসেন রতু এবং নাটোর থেকে ম্যাট্রিক পাস করে আজিজ মেহের ভর্তি হলেন সিরাজগঞ্জ কলেজে।
নতুন করে সংগঠিত হলো সিরাজগঞ্জের ভাষা আন্দোলন। আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯৫২ সালের ৩ জানুয়ারি ভাষা সৈনিক আজিজ মেহের সিরাজগঞ্জ কলেজের বড়ইতলায় ছাত্রসভা আহ্বান করেন। সভায় কলেজ ছাত্রদের পাশাপাশি যোগ দেয় স্কুলের ছাত্ররাও। এই সভায় গঠিত হয় সিরাজগঞ্জের ’৫২-এর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম আর যুগ্ম আহ্বায়ক নির্বাচিত হন আজিজ মেহের (টুকু)। ওই সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ২১ ফেব্রুয়ারিতে সারাদিন হরতাল, মিছিল ও জনসভা অনুষ্ঠানের। প্রচারের প্রস্তুতিতে ১৮ জানুয়ারি শহরের বাজার স্টেশনে খোরশেদ আলমের বাসায় গোপন প্রস্তুতি বৈঠকে অংশ নেন সাইফুল ইসলাম, মির আবুল হোসেন, মশিউর রহমান টুকু, আনোয়ার হোসেন রতু, তমিজুল ইসলাম, আব্দুল মমিন চাল্লি, আব্দুর রশিদ নান্নু প্রমুখ ভাষা সৈনিকরা। ২১ জানুয়ারি রেনেসাঁ ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয় আর এক পরিকল্পনা বৈঠক। সংগ্রাম কমিটি ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় খাজা নাজিমুদ্দিনের বাংলা ভাষা বিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদে সিরাজগঞ্জ শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করেন। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে রেনেসাঁ ক্লাবে ২১ ফেব্রুয়ারিতে প্রতিবাদ দিবস পালনের মধ্যদিয়ে প্রস্তুতি সভার মধ্যদিয়ে সিরাজগঞ্জের ভাষা সৈনিকরা ৫২-এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন গড়ে তোলেন মজবুত ভিতের ওপর। ফলশ্রুতিতে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ভাষা আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে সিরাজগঞ্জে তাৎক্ষণিক স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট পালিত হয়। এদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বন্ধ থাকে শহরের দোকানপাট। ভাষা সৈনিক সাইফুল ইসলাম, আজিজ মেহের, আনোয়ার হোসেন রতু, তমিজুল ইসলাম, সৈয়দ কায়সার আলী, মফিজ উদ্দিন, হায়দার আলী, সাহেব আলী, মুরাদুজ্জামান, আবুল হোসেন, নূরুন্নবি খান পুতুল, আব্দুল মমিন চাল্লি, আব্দুর রশিদ নান্নু, বি. এল. স্কুলের ছাত্র সূর্যকান্ত দে, নির্মল বসাক, হান্নান তালুকদার, জ্ঞানদায়িনী স্কুলের ছাত্র আলি আকবর খান প্রমুখের নেতৃত্বে হাজার হাজার ছাত্র জনতা কালো ব্যাজধারণ করে ‘নুইরা-নাজিম দুই ভাই এক দড়িতে ফাঁসি চাই’ শ্লোগানে ভাষার দাবির মিছিল প্রকম্পিত করে শহরের রাস্তা। সেদিন ভাষার দাবির মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে চৌরাস্তা (বর্তমানের সিরাজগঞ্জ প্রেসক্লাব) মোড়ে এসে শেষ হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি এই আন্দোলনে প্রথমবারের মত রাস্তায় নেমে আসে নারীরা। নেতৃত্ব দেয় সরকারি সালেহা স্কুলের শিক্ষার্থী বিজলী, মেহের নিগার, হেনা, মনিকা প্রমুখ শিক্ষার্থী। ওই দিন রাতে গ্রেফতার করা হয় সাইফুল ইসলাম, তমিজুল ইসলাম, মফিজউদ্দিন তালুকদার, সৈয়দ কায়সার আলী, জাফর ইমাম ভোলা, আলি আকবরসহ অনেক ছাত্রনেতাকে।
২৩ ফেব্রুয়ারি আহূত ধর্মঘট সফলভাবে পালিত হয়। ২৪ ও ২৫ তারিখেও ধর্মঘট অব্যাহত থাকে। আন্দোলনে যুক্ত হলেন আসগর আলি মোক্তার ও আমির হোসেন উকিল (মহকুমা আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ও সম্পাদক)-এর মত রাজনীতিবিদগণ। আন্দোলনে যুক্ত হয় ফররুখ শিয়র, সাহেব আলী (হেলাল প্রেস), হাফিজউদ্দিন তালুকদার, ছানাউল্লাহ মুন্সি, খোদা বক্স রোকনি, সৈয়দ হায়দার আলি (প্রাক্তন সংসদ সদস্য), সাগির মাস্টার, আবুল কাশেম নুরে এলাহি, সৈয়দ আনোয়ার।
হোসেন, সাহাবুদ্দিন সরকার, আবুল ফাত্তাহ নুরে এলাহি, জিতেন্দ্ৰনাথ নিয়োগী। যুক্ত হয় সিরাজগঞ্জের শ্রমিক আন্দোলনের পুরোধা শ্রমিক নেতা কমরেড আবু বকর সিদ্দিকী, বিড়ি শ্রমিক নেতা আবুল হোসেন, শ্রমিক নেতা জসিম উদ্দিন, মহিরউদ্দিন, আব্দুল মালেক, শামছু আরও অনেকে।
আন্দোলনের সাথে যুক্ত হলেন রিকশা শ্রমিক, গরুর গাড়ির শ্রমিক, বিড়ি শ্রমিক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রগতিশীল অংশ। ভাষার দাবি শহর থেকে ছড়িয়ে পড়ল গ্রামে। শহরের বাইরে ফুলবাড়ি গ্রামবাসী করে প্রতিবাদ সভা। আন্দোলনে ঘটে গুণগত পরিবর্তন। ছাত্র-শ্রমিক-রাজনীতিকদের সক্রিয়তায় ২৩, ২৪, ২৫, ২৬ ফেব্রুয়ারিতে অভূতপূর্ব সাড়া দেয় জনতা। হরতাল দোকানপাট, কাঁচাবাজার, কোর্ট-কাচারি, অফিস বন্ধ ছিল। এসময় শহরে কোন যানবাহন চলেনি।
তখন মোবাইল ছিল না। মাইক ছিল না। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিল না। তারপরও হরতাল আর জনসভার ঢেউ উচলিয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। তরকারি বিক্রেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষেরা আন্দোলনের খবর বয়ে নিয়ে গেল গ্রামে গ্রামে। দূর-দূরান্ত গ্রাম থেকে ছাত্ররা শহরে এসে যোগাযোগ করল ভাষা আন্দোলনের সংগঠকদের সাথে। শহর থেকে পরামর্শ নিয়ে গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাষা আন্দোলনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করত। সিরাজগঞ্জ শহরের বাইরে শাহজাদপুর, রায়গঞ্জ ও উল্লাপাড়ার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররাও আন্দোলন গড়ে তোলে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি হতে মাসের শেষ দিন পর্যন্ত আন্দোলন সংগ্রাম চলে। মার্চ মাসে এসে আন্দোলনকারীরা সিদ্ধান্ত নেন ‘একুশ’-এর শহীদদের স্মরণে শহিদ মিনার নির্মাণের। সিরাজগঞ্জ শহরের মাঝ বরাবর নির্মিত হয়েছে ইলিওট ব্রিজ। লোকে বলে বড়পুল। সেই বড়পুলের পূর্বপ্রান্তের খালি জায়গায় শহিদ মিনার নির্মাণের প্রস্তুতি নিল ভাষা সংগ্রামীরা। কিন্তু প্রশাসনের বাধার মুখে প্রথম শহিদ মিনার নির্মাণ সম্ভব হয়নি। শহিদ মিনার নির্মাণের দ্বিতীয় পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ১৯৫৩ সালে। ঐক্যমত হলেন রাজনৈতিক, শ্রমিক এবং ছাত্রনেতারা। বড়পুলের পূর্বপার্শ্বে পূর্ব নির্ধারিত স্থানেই নির্মিত হলো মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে শহিদ মিনার। এই শহিদ মিনারটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে সিরাজগঞ্জ রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নূর মোহাম্মদ-এর পাঁচ বছরের শিশু সন্তান জিন্নাত আলি। শুধু সিরাজগঞ্জ নয়। সিরাজগঞ্জের বাইরে ঢাকায় ভাষা আন্দোলনে এই জেলার কৃতিসন্তান মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ, আব্দুল মতিন (ভাষা মতিন), আলি আজমল, আব্দুল মমিন তালুকদার, নূরুল আলম, ডা. মতিয়ার রহমান, ডা. মহিউদ্দিন আহমেদ খান, মোতালেব খান রাখেন নেতৃত্বের ভূমিকা।
এভাবেই সিরাজগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জের বাইরে জাতীয় পর্যায়ে এ জেলার কৃতিসন্তানেরা বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি সংস্কৃতির চেতনার বিকাশে রাখেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। আর এই আন্দোলনের পথ ধরেই ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যদিয়ে ১৯৭১ সালে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা ভাষাভাষি জনগণের একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

লেখাটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ভাষা আন্দোলনে সিরাজগঞ্জ জেলার ইতিহাস

আপডেট সময় : ০২:২৯:৪৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
১৯৪৮ সালে সিরাজগঞ্জে ভাষা আন্দোলন সংগঠিত করেন তিন বন্ধু। সাইফুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম ও মির আবুল হোসেন। “লড়কে লেয়েঙ্গে পাকিস্তান- ছিনকে লেয়েঙ্গে পাকিস্তান। হাতমে বিড়ি, মুখে পান, লড়কে লেয়েঙ্গা পাকিস্তান”- ভ্রান্তির শ্লোগানে উদ্বুদ্ধ হয়ে পাকিস্তান কায়েমের মুরুব্বিদের অসহযোগিতায় ‘৪৮-এর পর আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু এতে করেও থেমে থাকেনি সিরাজগঞ্জের ভাষা সৈনিকরা।
‘৪৮-এর পর উর্দু সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা পরিচালনা করে বাংলা ভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। ৫০ সালের পর আন্দোলনে মাত্রা বাড়তে থাকে। ৫২ সালে সেই আন্দোলন নতুন করে বেগবান হয়। ইতোমধ্যে ৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বের তিন তরুণের একজন মির আবুল হোসেন চলে যান গ্রামের বাড়ি। নজরুল ইসলাম চলে যান অন্য শহর। এসময় পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে ম্যাট্রিক পাস করে আনোয়ার হোসেন রতু এবং নাটোর থেকে ম্যাট্রিক পাস করে আজিজ মেহের ভর্তি হলেন সিরাজগঞ্জ কলেজে।
নতুন করে সংগঠিত হলো সিরাজগঞ্জের ভাষা আন্দোলন। আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯৫২ সালের ৩ জানুয়ারি ভাষা সৈনিক আজিজ মেহের সিরাজগঞ্জ কলেজের বড়ইতলায় ছাত্রসভা আহ্বান করেন। সভায় কলেজ ছাত্রদের পাশাপাশি যোগ দেয় স্কুলের ছাত্ররাও। এই সভায় গঠিত হয় সিরাজগঞ্জের ’৫২-এর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম আর যুগ্ম আহ্বায়ক নির্বাচিত হন আজিজ মেহের (টুকু)। ওই সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ২১ ফেব্রুয়ারিতে সারাদিন হরতাল, মিছিল ও জনসভা অনুষ্ঠানের। প্রচারের প্রস্তুতিতে ১৮ জানুয়ারি শহরের বাজার স্টেশনে খোরশেদ আলমের বাসায় গোপন প্রস্তুতি বৈঠকে অংশ নেন সাইফুল ইসলাম, মির আবুল হোসেন, মশিউর রহমান টুকু, আনোয়ার হোসেন রতু, তমিজুল ইসলাম, আব্দুল মমিন চাল্লি, আব্দুর রশিদ নান্নু প্রমুখ ভাষা সৈনিকরা। ২১ জানুয়ারি রেনেসাঁ ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয় আর এক পরিকল্পনা বৈঠক। সংগ্রাম কমিটি ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় খাজা নাজিমুদ্দিনের বাংলা ভাষা বিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদে সিরাজগঞ্জ শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করেন। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে রেনেসাঁ ক্লাবে ২১ ফেব্রুয়ারিতে প্রতিবাদ দিবস পালনের মধ্যদিয়ে প্রস্তুতি সভার মধ্যদিয়ে সিরাজগঞ্জের ভাষা সৈনিকরা ৫২-এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন গড়ে তোলেন মজবুত ভিতের ওপর। ফলশ্রুতিতে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ভাষা আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে সিরাজগঞ্জে তাৎক্ষণিক স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট পালিত হয়। এদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বন্ধ থাকে শহরের দোকানপাট। ভাষা সৈনিক সাইফুল ইসলাম, আজিজ মেহের, আনোয়ার হোসেন রতু, তমিজুল ইসলাম, সৈয়দ কায়সার আলী, মফিজ উদ্দিন, হায়দার আলী, সাহেব আলী, মুরাদুজ্জামান, আবুল হোসেন, নূরুন্নবি খান পুতুল, আব্দুল মমিন চাল্লি, আব্দুর রশিদ নান্নু, বি. এল. স্কুলের ছাত্র সূর্যকান্ত দে, নির্মল বসাক, হান্নান তালুকদার, জ্ঞানদায়িনী স্কুলের ছাত্র আলি আকবর খান প্রমুখের নেতৃত্বে হাজার হাজার ছাত্র জনতা কালো ব্যাজধারণ করে ‘নুইরা-নাজিম দুই ভাই এক দড়িতে ফাঁসি চাই’ শ্লোগানে ভাষার দাবির মিছিল প্রকম্পিত করে শহরের রাস্তা। সেদিন ভাষার দাবির মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে চৌরাস্তা (বর্তমানের সিরাজগঞ্জ প্রেসক্লাব) মোড়ে এসে শেষ হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি এই আন্দোলনে প্রথমবারের মত রাস্তায় নেমে আসে নারীরা। নেতৃত্ব দেয় সরকারি সালেহা স্কুলের শিক্ষার্থী বিজলী, মেহের নিগার, হেনা, মনিকা প্রমুখ শিক্ষার্থী। ওই দিন রাতে গ্রেফতার করা হয় সাইফুল ইসলাম, তমিজুল ইসলাম, মফিজউদ্দিন তালুকদার, সৈয়দ কায়সার আলী, জাফর ইমাম ভোলা, আলি আকবরসহ অনেক ছাত্রনেতাকে।
২৩ ফেব্রুয়ারি আহূত ধর্মঘট সফলভাবে পালিত হয়। ২৪ ও ২৫ তারিখেও ধর্মঘট অব্যাহত থাকে। আন্দোলনে যুক্ত হলেন আসগর আলি মোক্তার ও আমির হোসেন উকিল (মহকুমা আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ও সম্পাদক)-এর মত রাজনীতিবিদগণ। আন্দোলনে যুক্ত হয় ফররুখ শিয়র, সাহেব আলী (হেলাল প্রেস), হাফিজউদ্দিন তালুকদার, ছানাউল্লাহ মুন্সি, খোদা বক্স রোকনি, সৈয়দ হায়দার আলি (প্রাক্তন সংসদ সদস্য), সাগির মাস্টার, আবুল কাশেম নুরে এলাহি, সৈয়দ আনোয়ার।
হোসেন, সাহাবুদ্দিন সরকার, আবুল ফাত্তাহ নুরে এলাহি, জিতেন্দ্ৰনাথ নিয়োগী। যুক্ত হয় সিরাজগঞ্জের শ্রমিক আন্দোলনের পুরোধা শ্রমিক নেতা কমরেড আবু বকর সিদ্দিকী, বিড়ি শ্রমিক নেতা আবুল হোসেন, শ্রমিক নেতা জসিম উদ্দিন, মহিরউদ্দিন, আব্দুল মালেক, শামছু আরও অনেকে।
আন্দোলনের সাথে যুক্ত হলেন রিকশা শ্রমিক, গরুর গাড়ির শ্রমিক, বিড়ি শ্রমিক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রগতিশীল অংশ। ভাষার দাবি শহর থেকে ছড়িয়ে পড়ল গ্রামে। শহরের বাইরে ফুলবাড়ি গ্রামবাসী করে প্রতিবাদ সভা। আন্দোলনে ঘটে গুণগত পরিবর্তন। ছাত্র-শ্রমিক-রাজনীতিকদের সক্রিয়তায় ২৩, ২৪, ২৫, ২৬ ফেব্রুয়ারিতে অভূতপূর্ব সাড়া দেয় জনতা। হরতাল দোকানপাট, কাঁচাবাজার, কোর্ট-কাচারি, অফিস বন্ধ ছিল। এসময় শহরে কোন যানবাহন চলেনি।
তখন মোবাইল ছিল না। মাইক ছিল না। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিল না। তারপরও হরতাল আর জনসভার ঢেউ উচলিয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। তরকারি বিক্রেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষেরা আন্দোলনের খবর বয়ে নিয়ে গেল গ্রামে গ্রামে। দূর-দূরান্ত গ্রাম থেকে ছাত্ররা শহরে এসে যোগাযোগ করল ভাষা আন্দোলনের সংগঠকদের সাথে। শহর থেকে পরামর্শ নিয়ে গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাষা আন্দোলনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করত। সিরাজগঞ্জ শহরের বাইরে শাহজাদপুর, রায়গঞ্জ ও উল্লাপাড়ার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররাও আন্দোলন গড়ে তোলে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি হতে মাসের শেষ দিন পর্যন্ত আন্দোলন সংগ্রাম চলে। মার্চ মাসে এসে আন্দোলনকারীরা সিদ্ধান্ত নেন ‘একুশ’-এর শহীদদের স্মরণে শহিদ মিনার নির্মাণের। সিরাজগঞ্জ শহরের মাঝ বরাবর নির্মিত হয়েছে ইলিওট ব্রিজ। লোকে বলে বড়পুল। সেই বড়পুলের পূর্বপ্রান্তের খালি জায়গায় শহিদ মিনার নির্মাণের প্রস্তুতি নিল ভাষা সংগ্রামীরা। কিন্তু প্রশাসনের বাধার মুখে প্রথম শহিদ মিনার নির্মাণ সম্ভব হয়নি। শহিদ মিনার নির্মাণের দ্বিতীয় পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ১৯৫৩ সালে। ঐক্যমত হলেন রাজনৈতিক, শ্রমিক এবং ছাত্রনেতারা। বড়পুলের পূর্বপার্শ্বে পূর্ব নির্ধারিত স্থানেই নির্মিত হলো মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে শহিদ মিনার। এই শহিদ মিনারটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে সিরাজগঞ্জ রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নূর মোহাম্মদ-এর পাঁচ বছরের শিশু সন্তান জিন্নাত আলি। শুধু সিরাজগঞ্জ নয়। সিরাজগঞ্জের বাইরে ঢাকায় ভাষা আন্দোলনে এই জেলার কৃতিসন্তান মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ, আব্দুল মতিন (ভাষা মতিন), আলি আজমল, আব্দুল মমিন তালুকদার, নূরুল আলম, ডা. মতিয়ার রহমান, ডা. মহিউদ্দিন আহমেদ খান, মোতালেব খান রাখেন নেতৃত্বের ভূমিকা।
এভাবেই সিরাজগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জের বাইরে জাতীয় পর্যায়ে এ জেলার কৃতিসন্তানেরা বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি সংস্কৃতির চেতনার বিকাশে রাখেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। আর এই আন্দোলনের পথ ধরেই ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যদিয়ে ১৯৭১ সালে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা ভাষাভাষি জনগণের একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ।