সিরাজগঞ্জ শহরের চার বোনের হারানো ইতিহাস

লেখকের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৭:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬
  • / ৪৭৯ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সিরাজগঞ্জ এর সর্বশেষ ও জনপ্রিয় লেখা অনুসরণ করতে গুগল নিউজফিড দেখুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কোন এক সময় সিরাজগঞ্জ শহরে চার বোন ছিল।
তাদের নাম হলো—মমতাজ, লক্ষী, গোধূলি আর মৌসুমী।
রূপে-গুণে তারা ছিল শহরের গর্ব। মাসে একবার হলেও আশপাশের উপজেলা, এমনকি দূরের জেলা থেকেও মানুষ ছুটে আসত শুধু তাদের এক ঝলক দেখার জন্য। সন্ধ্যা নামলেই তাদের উঠোনে শুরু হতো মানুষের ঢল। কারও হাতে বাদাম, কারও হাতে চানাচুর, কারও হাতে প্রিয় মানুষের হাত।
কেউ প্রথম প্রেমে পড়েছে তাদের সামনে বসে, কেউ বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া মিটিয়েছে, কেউ বাবার কাঁধে চড়ে প্রথম সিনেমা দেখেছে, কেউ আবার জীবনের প্রথম চোখের জল ফেলেছে কোনো নায়কের মৃত্যুর দৃশ্যে।
তারা শুধু চার বোন ছিল না, হাজার হাজার মানুষের জীবনের স্মৃতির খাতা ছিল।
ঈদের দিন হলে তো কথাই নেই। সকাল থেকেই লম্বা লাইন। নতুন জামার ঘ্রাণ, আতরের সুবাস, রঙিন পোস্টার, টিকিটের জন্য ঠেলাঠেলি—সব মিলিয়ে যেন এক অন্যরকম উৎসব।
মমতাজ ছিল সবচেয়ে অভিজাত, লক্ষী ছিল সবার আপন, গোধূলি ছিল প্রেমিক-প্রেমিকাদের প্রিয় ঠিকানা আর মৌসুমী ছিল নতুন স্বপ্নের রঙে রাঙানো ছোট বোন।
সময় বড় নিষ্ঠুর।
একদিন শহরে এলো রঙিন টেলিভিশন, তারপর সিডি, তারপর ডিভিডি, এরপর মোবাইল ফোন, সবশেষে ইন্টারনেট।
মানুষ আর চার বোনের কাছে আসে না।
একসময় যেখানে হাজার মানুষের হাসি-তালি উঠত, সেখানে এখন শুধু বাতাস ঢোকে। যেখানে বাঁশির শব্দে শো শুরু হতো, সেখানে এখন বাদুড় ডানা ঝাপটায়। যেখানে প্রেমিক বলত, “সিনেমা শেষ হলেও হাতটা ছাড়িস না”, সেখানে এখন আগাছা জন্মায়।

একদিন বৃদ্ধ রফিক সাহেব তাঁর নাতিকে নিয়ে সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন।
নাতি জিজ্ঞেস করল, “দাদু, এই ভাঙা বিল্ডিংগুলো কী?”
রফিক সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর কাঁপা গলায় বললেন,
“এগুলো বিল্ডিং না রে…
এরা ছিল আমাদের যৌবন।”
নাতি কিছুই বুঝল না।
কিন্তু দাদুর চোখের কোণে জমে উঠল জল।
তিনি মনে মনে ফিরে গেলেন পঁয়তাল্লিশ বছর আগে।
সেই প্রথম প্রেম…সেই প্রথম সিনেমা…সেই প্রথম হাত ধরা…সেই প্রথম কাঁদা…
হঠাৎ মনে হলো, ভাঙা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে কেউ যেন ডাকছে—
“এতদিন পরে এলে?”
রফিক সাহেব চমকে তাকালেন।
না, কেউ নেই।
শুধু বাতাসে উড়ে আসা একটি পুরোনো সিনেমার পোস্টারের ছেঁড়া টুকরো।
মনে হলো চার বোন এখনও অপেক্ষা করে আছে।
হয়তো কোনো এক সন্ধ্যায় আবার কেউ এসে বলবে—
“দুইটা টিকিট দেন… বারান্দার।”
কিন্তু টিকিট কাউন্টার আর খোলে না।
প্রজেক্টরের আলো আর জ্বলে না।
শুধু স্মৃতির পর্দায় এখনও চলছে সেই সিনেমা—যেখানে চার বোন বেঁচে আছে, মানুষের হাসিতে, কান্নায়, ভালোবাসায়।
কারণ কিছু মৃত্যু কবরস্থানে হয় না।
কিছু মৃত্যু হয় মানুষের ব্যস্ততায়।
আর কিছু মানুষ কখনো সত্যি হারিয়ে যায় না।
তারা বেঁচে থাকে স্মৃতির শহরে।
সিরাজগঞ্জের চার বোন—মমতাজ, লক্ষী, গোধূলি আর মৌসুমী—আজও সেখানে বেঁচে আছে। শুধু তাদের দেখতে এখন টিকিট লাগে না, লাগে একটি স্মৃতিভরা মন।

  • Array,Array,Array,Array,Array,Array,Array

লেখাটি শেয়ার করুন

সিরাজগঞ্জ শহরের চার বোনের হারানো ইতিহাস

আপডেট সময় : ০৯:৫৭:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

কোন এক সময় সিরাজগঞ্জ শহরে চার বোন ছিল।
তাদের নাম হলো—মমতাজ, লক্ষী, গোধূলি আর মৌসুমী।
রূপে-গুণে তারা ছিল শহরের গর্ব। মাসে একবার হলেও আশপাশের উপজেলা, এমনকি দূরের জেলা থেকেও মানুষ ছুটে আসত শুধু তাদের এক ঝলক দেখার জন্য। সন্ধ্যা নামলেই তাদের উঠোনে শুরু হতো মানুষের ঢল। কারও হাতে বাদাম, কারও হাতে চানাচুর, কারও হাতে প্রিয় মানুষের হাত।
কেউ প্রথম প্রেমে পড়েছে তাদের সামনে বসে, কেউ বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া মিটিয়েছে, কেউ বাবার কাঁধে চড়ে প্রথম সিনেমা দেখেছে, কেউ আবার জীবনের প্রথম চোখের জল ফেলেছে কোনো নায়কের মৃত্যুর দৃশ্যে।
তারা শুধু চার বোন ছিল না, হাজার হাজার মানুষের জীবনের স্মৃতির খাতা ছিল।
ঈদের দিন হলে তো কথাই নেই। সকাল থেকেই লম্বা লাইন। নতুন জামার ঘ্রাণ, আতরের সুবাস, রঙিন পোস্টার, টিকিটের জন্য ঠেলাঠেলি—সব মিলিয়ে যেন এক অন্যরকম উৎসব।
মমতাজ ছিল সবচেয়ে অভিজাত, লক্ষী ছিল সবার আপন, গোধূলি ছিল প্রেমিক-প্রেমিকাদের প্রিয় ঠিকানা আর মৌসুমী ছিল নতুন স্বপ্নের রঙে রাঙানো ছোট বোন।
সময় বড় নিষ্ঠুর।
একদিন শহরে এলো রঙিন টেলিভিশন, তারপর সিডি, তারপর ডিভিডি, এরপর মোবাইল ফোন, সবশেষে ইন্টারনেট।
মানুষ আর চার বোনের কাছে আসে না।
একসময় যেখানে হাজার মানুষের হাসি-তালি উঠত, সেখানে এখন শুধু বাতাস ঢোকে। যেখানে বাঁশির শব্দে শো শুরু হতো, সেখানে এখন বাদুড় ডানা ঝাপটায়। যেখানে প্রেমিক বলত, “সিনেমা শেষ হলেও হাতটা ছাড়িস না”, সেখানে এখন আগাছা জন্মায়।

একদিন বৃদ্ধ রফিক সাহেব তাঁর নাতিকে নিয়ে সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন।
নাতি জিজ্ঞেস করল, “দাদু, এই ভাঙা বিল্ডিংগুলো কী?”
রফিক সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর কাঁপা গলায় বললেন,
“এগুলো বিল্ডিং না রে…
এরা ছিল আমাদের যৌবন।”
নাতি কিছুই বুঝল না।
কিন্তু দাদুর চোখের কোণে জমে উঠল জল।
তিনি মনে মনে ফিরে গেলেন পঁয়তাল্লিশ বছর আগে।
সেই প্রথম প্রেম…সেই প্রথম সিনেমা…সেই প্রথম হাত ধরা…সেই প্রথম কাঁদা…
হঠাৎ মনে হলো, ভাঙা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে কেউ যেন ডাকছে—
“এতদিন পরে এলে?”
রফিক সাহেব চমকে তাকালেন।
না, কেউ নেই।
শুধু বাতাসে উড়ে আসা একটি পুরোনো সিনেমার পোস্টারের ছেঁড়া টুকরো।
মনে হলো চার বোন এখনও অপেক্ষা করে আছে।
হয়তো কোনো এক সন্ধ্যায় আবার কেউ এসে বলবে—
“দুইটা টিকিট দেন… বারান্দার।”
কিন্তু টিকিট কাউন্টার আর খোলে না।
প্রজেক্টরের আলো আর জ্বলে না।
শুধু স্মৃতির পর্দায় এখনও চলছে সেই সিনেমা—যেখানে চার বোন বেঁচে আছে, মানুষের হাসিতে, কান্নায়, ভালোবাসায়।
কারণ কিছু মৃত্যু কবরস্থানে হয় না।
কিছু মৃত্যু হয় মানুষের ব্যস্ততায়।
আর কিছু মানুষ কখনো সত্যি হারিয়ে যায় না।
তারা বেঁচে থাকে স্মৃতির শহরে।
সিরাজগঞ্জের চার বোন—মমতাজ, লক্ষী, গোধূলি আর মৌসুমী—আজও সেখানে বেঁচে আছে। শুধু তাদের দেখতে এখন টিকিট লাগে না, লাগে একটি স্মৃতিভরা মন।

  • Array,Array,Array,Array,Array,Array,Array