১৯৩৬ সালের দিকে এই স্থানে হুরাসাগর নদীর কোনো অস্তিত্ব ছিল না

হুরাসাগরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাস — মাটি বেহাল এক রহস্যময় কূপ

রেজওয়ান
  • আপডেট সময় : ০৪:৫২:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ৯৭৭ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সিরাজগঞ্জ এর সর্বশেষ ও জনপ্রিয় লেখা অনুসরণ করতে গুগল নিউজফিড দেখুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ছবিটিতে দেখা নদীটির নাম হুরাসাগর। সিরাজগঞ্জ জেলার অন্তত পাঁচটি উপজেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত এই নদীর একাধিক শাখা ও প্রবাহ রয়েছে কামারখন্দ উপজেলায়। কালের বিবর্তন ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে হুরাসাগর নদীটি বাঁশবাড়ীয়া ও চর-বাঁশবাড়ীয়া গ্রামের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে একটি গ্রাম কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

 

১৯৩৬ সালের দিকে এই স্থানে হুরাসাগর নদীর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তখন এখানে ছিল বসতভিটা, জনবসতি ও স্বাভাবিক গ্রামজীবন। বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন মেটাতে সে সময় গ্রামবাসীরা নির্মাণ করেন একটি বিশাল কূপ, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ ফুট।

 

১৯৭১ সাল পর্যন্ত কূপটির প্রায় ৩ ফুট অংশ মাটির ওপরে দৃশ্যমান ছিল, আর বাকি ৫৭ ফুট ছিল মাটির গভীরে। একসময় এই কূপের পানিই ছিল পুরো গ্রামের একমাত্র পানযোগ্য পানির উৎস। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নদীর গতিপথ বদলে গেলে আশপাশের মাটি সরে যায়। বর্তমানে কূপটির মাত্র ৩–৫ ফুট অংশ মাটির নিচে, আর প্রায় ৫৬ ফুট অংশ শূন্যে দাঁড়িয়ে আছে—প্রায় ৪৫ বছর ধরে একই অবস্থায়।

 

প্রবল বন্যার বছর ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে হুরাসাগরের ভয়ংকর পানির স্রোতও এই কূপটির কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধের কিছু সরঞ্জাম এই কূপে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

 

আজ কূপটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। যে কোনো সময় এটি ভেঙে পড়তে পারে এবং হারিয়ে যেতে পারে সিরাজগঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন।

 

হুরাসাগর নামটি শুনতে যতটা বিশাল মনে হয়, বাস্তবে নদীটি এখন বছরের বেশির ভাগ সময়ই পানি শূন্য। কোথাও কোথাও এটি খাল বা বিলের মতো রূপ নিয়েছে। এক সময় এই নদীতে মাছ ধরে বহু মানুষের জীবিকা চলত, কিন্তু এখন মাছ প্রায় বিলুপ্ত।

 

কূপটিকে ঘিরে রয়েছে নানা রহস্য ও লোককথা। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই কূপের আশপাশে এক সময় “দেউ” নামের এক দানবের বসবাস ছিল। কেউ এখানে গোসল করতে নামলে গভীর পানিতে টেনে নেওয়ার ঘটনাও লোকমুখে শোনা যায়।

 

যাত্রাপথে কেউ এই অঞ্চলে এলে চোখে পড়বে—মাটি ছাড়াই দাঁড়িয়ে থাকা এক বিস্ময়কর কূপ, যা নীরবে সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছে সময়, নদী আর মানুষের ইতিহাসের।

 

কিভাবে যাবেন?

উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, তাড়াশ, রায়গঞ্জ ও কাজিপুর থেকে আসলে

👉 জামতৈল স্টেশন এসে “বাঁশবাড়ীয়া” বললেই হবে।

 

বেলকুচি ও চৌহালি দিক থেকে এলে

👉 তামাই বা কাজিপুরা এসে বাঁশবাড়ীয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে পথ দেখিয়ে দেবে স্থানীয়রা।

 

এই কূপ শুধু একটি পরিত্যক্ত স্থাপনা নয়—এটি হুরাসাগরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত ইতিহাস।

লেখাটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

১৯৩৬ সালের দিকে এই স্থানে হুরাসাগর নদীর কোনো অস্তিত্ব ছিল না

হুরাসাগরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাস — মাটি বেহাল এক রহস্যময় কূপ

আপডেট সময় : ০৪:৫২:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫

ছবিটিতে দেখা নদীটির নাম হুরাসাগর। সিরাজগঞ্জ জেলার অন্তত পাঁচটি উপজেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত এই নদীর একাধিক শাখা ও প্রবাহ রয়েছে কামারখন্দ উপজেলায়। কালের বিবর্তন ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে হুরাসাগর নদীটি বাঁশবাড়ীয়া ও চর-বাঁশবাড়ীয়া গ্রামের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে একটি গ্রাম কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

 

১৯৩৬ সালের দিকে এই স্থানে হুরাসাগর নদীর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তখন এখানে ছিল বসতভিটা, জনবসতি ও স্বাভাবিক গ্রামজীবন। বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন মেটাতে সে সময় গ্রামবাসীরা নির্মাণ করেন একটি বিশাল কূপ, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ ফুট।

 

১৯৭১ সাল পর্যন্ত কূপটির প্রায় ৩ ফুট অংশ মাটির ওপরে দৃশ্যমান ছিল, আর বাকি ৫৭ ফুট ছিল মাটির গভীরে। একসময় এই কূপের পানিই ছিল পুরো গ্রামের একমাত্র পানযোগ্য পানির উৎস। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নদীর গতিপথ বদলে গেলে আশপাশের মাটি সরে যায়। বর্তমানে কূপটির মাত্র ৩–৫ ফুট অংশ মাটির নিচে, আর প্রায় ৫৬ ফুট অংশ শূন্যে দাঁড়িয়ে আছে—প্রায় ৪৫ বছর ধরে একই অবস্থায়।

 

প্রবল বন্যার বছর ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে হুরাসাগরের ভয়ংকর পানির স্রোতও এই কূপটির কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধের কিছু সরঞ্জাম এই কূপে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

 

আজ কূপটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। যে কোনো সময় এটি ভেঙে পড়তে পারে এবং হারিয়ে যেতে পারে সিরাজগঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন।

 

হুরাসাগর নামটি শুনতে যতটা বিশাল মনে হয়, বাস্তবে নদীটি এখন বছরের বেশির ভাগ সময়ই পানি শূন্য। কোথাও কোথাও এটি খাল বা বিলের মতো রূপ নিয়েছে। এক সময় এই নদীতে মাছ ধরে বহু মানুষের জীবিকা চলত, কিন্তু এখন মাছ প্রায় বিলুপ্ত।

 

কূপটিকে ঘিরে রয়েছে নানা রহস্য ও লোককথা। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই কূপের আশপাশে এক সময় “দেউ” নামের এক দানবের বসবাস ছিল। কেউ এখানে গোসল করতে নামলে গভীর পানিতে টেনে নেওয়ার ঘটনাও লোকমুখে শোনা যায়।

 

যাত্রাপথে কেউ এই অঞ্চলে এলে চোখে পড়বে—মাটি ছাড়াই দাঁড়িয়ে থাকা এক বিস্ময়কর কূপ, যা নীরবে সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছে সময়, নদী আর মানুষের ইতিহাসের।

 

কিভাবে যাবেন?

উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, তাড়াশ, রায়গঞ্জ ও কাজিপুর থেকে আসলে

👉 জামতৈল স্টেশন এসে “বাঁশবাড়ীয়া” বললেই হবে।

 

বেলকুচি ও চৌহালি দিক থেকে এলে

👉 তামাই বা কাজিপুরা এসে বাঁশবাড়ীয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে পথ দেখিয়ে দেবে স্থানীয়রা।

 

এই কূপ শুধু একটি পরিত্যক্ত স্থাপনা নয়—এটি হুরাসাগরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত ইতিহাস।