শতবর্ষী ঐতিহ্যের ধারক তামাইয়ের লুঙ্গি: দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও খ্যাতি
তামাই: ১০ হাজার তাঁতের খটখট শব্দে বোনা হচ্ছে সমৃদ্ধির স্বপ্ন
- আপডেট সময় : ০৪:৫৪:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১২০০ বার পড়া হয়েছে
ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙ্গে গ্রামটির। চারপাশ তখনো আবছা অন্ধকারে ঢাকা, অথচ পুরো গ্রাম মুখরিত হয়ে ওঠে হাজার হাজার যান্ত্রিক তাঁতের খটখট শব্দে। সিরাজগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দক্ষিণে বেলকুচি উপজেলার এই গ্রামটির নাম ‘তামাই’। কেবল একটি জনপদ নয়, তামাই এখন দেশের লুঙ্গি শিল্পের ‘লাইফলাইন’।
গ্রামটির প্রধান প্রাণশক্তি ১০ হাজারের বেশি বিদ্যুৎচালিত তাঁতকল (পাওয়ার লুম)। এসব তাঁতে তৈরি রকমারি লুঙ্গি শুধু সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যকেই বাঁচিয়ে রাখেনি, বরং বদলে দিয়েছে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতির চিত্র।
কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির চাকা
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তামাই গ্রামের প্রায় ৯৫ ভাগ পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত। এই শিল্পের সুবাদে গ্রামটিতে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। শুধু স্থানীয়রাই নন, জীবিকার সন্ধানে উত্তরের জেলা রংপুর, কুড়িগ্রাম ও পাবনা থেকেও হাজারো শ্রমজীবী মানুষ এখানে এসে কাজ করছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, দিন-রাত অবিরাম চলছে কাপড় বুননের কাজ। একজন তাঁতশ্রমিক সাধারণত দুটি তাঁত পরিচালনা করেন এবং দিনে ৮ থেকে ১৫টি লুঙ্গি বুনতে পারেন। ঈদ, পূজা ও রমজান মাস ঘিরে এই কর্মব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েক গুণ।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী থেকে আসা শ্রমিক একরামুল হোসেন (৪০) বলেন, “গত ১০ বছর ধরে এখানে কাজ করছি। আগে এলাকায় রিকশা চালিয়ে সংসার চলত না। এখন এখানে কাজ করে নিজের খরচ বাদেও সপ্তাহে ১০ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠাতে পারি। পরিবারে এখন স্বচ্ছলতা ফিরেছে।”
নারীর ক্ষমতায়ন
তামাইয়ের তাঁতশিল্পে নারীদের অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মতো। সুতা পাকানো বা নলির কাজ করে অনেক নারী স্বাবলম্বী হয়েছেন। পাশের গ্রাম দেলুয়াকান্দি থেকে আসা জাহানারা আক্তার জানান, প্রায় আট বছর ধরে তিনি সুতা পাকানোর কাজ করছেন। স্বামীর আয়ের পাশাপাশি তার এই উপার্জনে সংসারে স্বস্তি এসেছে।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, তামাইয়ের লুঙ্গির খ্যাতি এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের বাজারেও পৌঁছে গেছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা এবং মিয়ানমারে এখানকার লুঙ্গি রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়া ইউরোপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছেও এই লুঙ্গির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
তামাই গ্রামের উত্তরপাড়ার তাঁতি আসাদুল ইসলাম বলেন, “আমরা উন্নত মানের রং ও সুতা ব্যবহার করে নতুন নকশায় লুঙ্গি তৈরি করি। দেশের নামকরা লুঙ্গি কোম্পানিগুলো আমাদের কাছ থেকে লুঙ্গি কিনে তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডে বাজারজাত করে।”
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন
শতাধিক বছর আগে এই গ্রামে হস্তচালিত তাঁতের মাধ্যমে শাড়ি ও গামছা তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল। তবে শাড়ির চেয়ে লুঙ্গি উৎপাদন লাভজনক ও ঝামেলামুক্ত হওয়ায় কারিগররা ধীরে ধীরে লুঙ্গির দিকে ঝুঁকে পড়েন। সময়ের বিবর্তনে হস্তচালিত তাঁতের জায়গা দখল করে নিয়েছে আধুনিক পাওয়ার লুম। বর্তমানে এখানে ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা দামের লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে।
তামাই গ্রামের ‘রাজবিথি লুঙ্গি’র স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম বলেন, “বাপ-দাদার আমল থেকে আমরা এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে আমার ৫৫টি তাঁত চলছে। আমাদের উৎপাদিত লুঙ্গি গুণগত মানের কারণে হাট-বাজার ও বড় কোম্পানিগুলোর কাছে বেশ জনপ্রিয়।”
জীবিকার চেয়েও বেশি কিছু
স্থানীয়দের কাছে এই তাঁতশিল্প কেবল ব্যবসার মাধ্যম নয়, বরং বংশপরম্পরায় বয়ে চলা এক উত্তরাধিকার। ফকিরপাড়া এলাকার তাঁতি শামীম মল্লিক বলেন, “গত দুই দশকে লুঙ্গি উৎপাদন করেই এই এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এই শিল্প আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে।”
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সুতোর টানে যে স্বপ্ন বোনা হচ্ছে তামাই গ্রামে, তা বাংলাদেশের তাঁতশিল্প টিকে থাকার সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল।










