মকবুলা মঞ্জুর : আধুনিক বাংলা উপন্যাসের এক শক্তিমান কণ্ঠ
- আপডেট সময় : ১০:১৭:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / ৭২১ বার পড়া হয়েছে
মকবুলা মঞ্জুর ছিলেন একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশী লেখক ও ঔপন্যাসিক। বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ধারায় তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সৈয়দুর রহমান প্রণীত ‘হিস্টরিক ডিকশনারি অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থে তাঁকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সেলিনা হোসেন ও হাসান হাফিজুর রহমানের সঙ্গে একই কাতারে স্থান দিয়েছেন। বাংলা উপন্যাসে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০০৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন।
প্রাথমিক জীবন
মকবুলা মঞ্জুর ১৯৩৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলার মুগবেলাই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মিজানুর রহমান ও মাতা মাহমুদা খাতুন। পিতা ছিলেন লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাত ভাই-বোনের এই পরিবারটি সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চায় ছিল সমৃদ্ধ। তাঁর ভাইদের মধ্যে ছিলেন প্রাবন্ধিক ড. মোখলেসুর রহমান, চলচ্চিত্র পরিচালক ইবনে মিজান ও প্রাবন্ধিক আজিজ মেহের। তিন বোন—জোবেদা খাতুন, অধ্যাপিকা মোসলেমা খাতুন ও মুশফিকা আহমেদ—তারাও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কিশোরী বয়সেই মকবুলা মঞ্জুর নাট্যাভিনয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বগুড়ায় অবস্থানকালে তিনি এডওয়ার্ড ঘূর্ণায়মান রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করেন। পাশাপাশি পটুয়া কামরুল হাসান প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক মুকুল ফৌজের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
শিক্ষাজীবন
১৯৫২ সালে টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি মাধ্যমিক পাশ করেন। ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি বিদ্যালয়ের হোস্টেলে অবস্থান করতেন। একদিন স্কুলের গেট ভেঙে মিছিলে যোগ দিয়ে ফিরে আসার পর তাঁসহ অন্যান্য ছাত্রীদের বিদ্যালয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এরপর তিনি ভাই আজিজ মেহেরের সঙ্গে টাঙ্গাইলে মামার বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং পরে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান।
পরবর্তীতে ভারতেশ্বরী হোমসে ভর্তি হলেও শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনে মানিয়ে নিতে না পেরে সেখান থেকে চলে আসেন। ১৯৫৪ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৫৮ সালে ইডেন মহিলা কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। দীর্ঘ বিরতির পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবন
মকবুলা মঞ্জুরের কর্মজীবন শুরু হয় তৎকালীন মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকে (বর্তমান রূপালী ব্যাংক) অফিসার হিসেবে। তবে তাঁর প্রকৃত স্বপ্ন ছিল শিক্ষকতা। সেই লক্ষ্যেই তিনি প্রায় অর্ধেক বেতনে হলিক্রস উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিদ্যালয়ের মাঠে জাতীয় পতাকা উত্তোলনে বাধা পেলে তিনি নিজেই পতাকা পুঁতে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন—যা তাঁর দেশপ্রেম ও সাহসী মানসিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পরবর্তীতে তিনি ইউনিভার্সিটি উইমেন্স কলেজ ও সাউথ ইস্ট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেন।
শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি প্রায় ২৫ বছর সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকার ফিচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও দৈনিক আজাদ পত্রিকার ফিচার সম্পাদক ছিলেন।
সাহিত্যজীবন
মাত্র আট বছর বয়স থেকেই মকবুলা মঞ্জুরের সাহিত্যচর্চা শুরু। শৈশবে লেখা ছড়া নিয়মিত দৈনিক আজাদ-এ প্রকাশিত হতো। তাঁর শুরুর দিকের একটি ছড়া—
“জ্বর হলে কি হয়?
ঘন ঘন খিদে পায়
ভাত খেতে প্রাণ চায়
ঔষধের তেতোমিতে
প্রাণ বুঝি চায় যেতে
চুপচাপ শুয়ে থাকা
লাগে বড় বিশ্রী
চেহারা যা হয়েছে
আহা সেকি সুশ্রী!”
১৮ বছর বয়স থেকে তিনি গদ্য সাহিত্যে গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, যুদ্ধোত্তর সমাজবাস্তবতা, রাজনৈতিক সংকট ও নারীবাদী ভাবনা তাঁর লেখার মূল উপজীব্য। বিশেষ করে ‘কালের মন্দিরা’ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ওপর সংঘটিত নির্যাতনের হৃদয়বিদারক চিত্র তিনি সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
পারিবারিক জীবন
১৯৬১ সালের ২৯ জুন মকবুলা মঞ্জুর আইনজীবী মনজুর হোসেনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের পারিবারিক পরিচয়ের সূত্র ছিল তাঁর ভাই পরিচালক ইবনে মিজান। এই দম্পতির সংসারে দুই কন্যা ও দুই পুত্র সন্তান রয়েছে।
গ্রন্থতালিকা :
- আর এক জীবন (১৯৬৮)
- অবসন্ন গান (১৯৮২)
- বৈশাখে শীর্ণ নদী (১৯৮৩)
- জল রং ছবি (১৯৮৪)
- আত্মজা ও আমরা (১৯৮৮)
- পতিত পৃথিবী (১৯৮৯)
- প্রেম এক সোনালী নদী (১৯৮৯)
- শিয়রে নিয়ত সূর্য (১৯৮৯)
- অচেনা নক্ষত্র (১৯৯০)
- কনে দেখা আলো (১৯৯১)
- নির্বাচিত প্রেমের উপন্যাস (১৯৯২)
- নদীতে অন্ধকার (১৯৯৬)
- লীলা কমল (১৯৯৬)
- কালের মন্দিরা (১৯৯৭)
- বাউল বাতাস
- ছায়াপথে দেখা
- একটাই জীবন
- সায়াহ্ন যূথিকা
- নক্ষত্রের তলে
পুরস্কার ও সম্মাননা
- বাংলা একাডেমি পুরস্কার (২০০৫) – উপন্যাস
- জাতীয় আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার শ্রেষ্ঠগ্রন্থ পুরস্কার (১৯৯৭) – কালের মন্দিরা
- অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (২০০৭)
- রাজশাহী লেখিকা সংঘ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৩)
- কমর মুশতারী পুরস্কার (১৯৯০) – কথাসাহিত্য
- বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার (১৯৮৪)
২০২০ সালের ৩ জুলাই এই গুণী সাহিত্যিক আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নেন। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।













