সিরাজগঞ্জের গুণী সন্তান আজিজ মেহের: জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

রেজওয়ান
  • আপডেট সময় : ০৪:৪০:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর ২০২৫
  • / ৭০৬ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সিরাজগঞ্জ এর সর্বশেষ ও জনপ্রিয় লেখা অনুসরণ করতে গুগল নিউজফিড দেখুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

একজন সিরাজগঞ্জের সন্তান—লেখক, প্রকাশক, সাংবাদিক, চিত্রপরিচালক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আজিজ মেহের (এস এম মসিউর রহমান)-এর আজ জন্মদিন। আজ তাঁর ৮৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

 

জন্ম: ১৪ নভেম্বর ১৯৩২ খ্রি.

মৃত্যু: ১০ আগস্ট ২০১৭ খ্রি.

 

আজিজ মেহের ১৯৩২ সালের ১৪ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার কালনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জে। বাবা মিজানুর রহমান ছিলেন একজন দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তা। সাত ভাইবোনের পরিবারে তিনি ছিলেন অন্যতম। বড় ভাই ড. মুখলেছুর রহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আরেক বড় ভাই খ্যাতিমান চিত্রপরিচালক ইবনে মিজান। বড় বোন অধ্যাপিকা মুসলেমা খাতুন, ছোট বোন বাংলা সাহিত্যের সুপরিচিত কথাসাহিত্যিক অধ্যাপিকা মকবুলা মঞ্জুর।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেন তিনি। জন্মনাম ছিল এস এম মসিউর রহমান, পারিবারিক ডাকনাম টুঙ্কু। তবে রাজনৈতিক জীবনের প্রেক্ষাপটে একটি ছদ্মনাম গ্রহণ করেন—আজিজ মেহের। পরবর্তীতে চলচ্চিত্র ও সাহিত্যজগতে এই নামেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন; সময়ের প্রবাহে তাঁর আসল নামটি প্রায় হারিয়েই যায়।

 

রাজনীতি ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি স্টিল ফটোগ্রাফিতে তাঁর ছিল অসাধারণ পারদর্শিতা। সেখান থেকেই চলচ্চিত্রজগতে তাঁর যাত্রা। এ জে কারদারের ‘দূর হ্যায় সুখ কা গাঁও’ চলচ্চিত্রে ব্যবস্থাপনা সহকারী হিসেবে প্রথম কাজ করেন তিনি। পরে ‘এই তো জীবন’ ছবির প্রযোজনা ব্যবস্থাপক এবং আলমগীর কবিরের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ধীরে বহে মেঘনা’–এর প্রধান সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

 

চিত্রপরিচালক হিসেবে আজিজ মেহেরের প্রথম কাজ ‘আওর গম নেহী’ (ইবনে মিজানের সঙ্গে যৌথভাবে), যদিও ছবিটি মুক্তি পায়নি। পরবর্তীতে দুই ভাই যৌথভাবে ‘একালের রূপকথা’ নির্মাণ করেন, যা ১৯৬৫ সালে মুক্তি পায়। তাঁর একক পরিচালনায় নির্মিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো ‘বিচার’ ও ‘আকাশ পরী’।

 

পরিচালনার পাশাপাশি তিনি অভিনয়, কাহিনি ও সংলাপ রচনাতেও সক্রিয় ছিলেন। ‘ধীরে বহে মেঘনা’, ‘রূপালী সৈকতে’, ‘পরিণীতা’ সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ‘জংলী মেয়ে’ ও ‘পাতালপুরীর রাজকন্যা’ ছবির কাহিনি ও সংলাপও তাঁরই লেখা।

 

লেখক হিসেবে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘স্মৃতি শুধু স্মৃতি নয়’, ‘নিষিদ্ধ কথকথা’, ‘আনন্দের ডায়েরি’, ‘ইনোনি শকুন্তলার ভালোবাসা’ প্রভৃতি। তিনি ‘বস্তু প্রকাশন’ নামে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যেখান থেকে বহু বিশিষ্ট লেখকের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

 

রাজনৈতিক জীবনে আজিজ মেহের ছিলেন একনিষ্ঠ ও সংগ্রামী। সাবেক নকশাল নেতা হিসেবে তিনি পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল, দেবেন শিকদার)-এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সারাজীবন কৃষক আন্দোলন, মওলানা ভাষানীর সঙ্গে কাগমারী সম্মেলন, সন্তোষের মহাসমাবেশে সক্রিয় ভূমিকা এবং পাকিস্তান ও পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কারণে একাধিকবার কারাবরণ করেন।

 

বাম রাজনীতির আদর্শে অনুপ্রাণিত হলেও আজিজ মেহের ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী—একজন মানবিক, সদালাপী, সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ। লেখক-প্রকাশক, সাংবাদিক-চিত্রপরিচালক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে তাঁর অবদান বাংলা সংস্কৃতিতে গভীরভাবে স্মরণীয়।

 

২০১৭ সালের ১০ আগস্ট ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে এই গুণী মানুষের স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা এবং তাঁর বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।

 

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট

লেখাটি শেয়ার করুন

সিরাজগঞ্জের গুণী সন্তান আজিজ মেহের: জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

আপডেট সময় : ০৪:৪০:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর ২০২৫

একজন সিরাজগঞ্জের সন্তান—লেখক, প্রকাশক, সাংবাদিক, চিত্রপরিচালক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আজিজ মেহের (এস এম মসিউর রহমান)-এর আজ জন্মদিন। আজ তাঁর ৮৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

 

জন্ম: ১৪ নভেম্বর ১৯৩২ খ্রি.

মৃত্যু: ১০ আগস্ট ২০১৭ খ্রি.

 

আজিজ মেহের ১৯৩২ সালের ১৪ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার কালনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জে। বাবা মিজানুর রহমান ছিলেন একজন দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তা। সাত ভাইবোনের পরিবারে তিনি ছিলেন অন্যতম। বড় ভাই ড. মুখলেছুর রহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আরেক বড় ভাই খ্যাতিমান চিত্রপরিচালক ইবনে মিজান। বড় বোন অধ্যাপিকা মুসলেমা খাতুন, ছোট বোন বাংলা সাহিত্যের সুপরিচিত কথাসাহিত্যিক অধ্যাপিকা মকবুলা মঞ্জুর।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেন তিনি। জন্মনাম ছিল এস এম মসিউর রহমান, পারিবারিক ডাকনাম টুঙ্কু। তবে রাজনৈতিক জীবনের প্রেক্ষাপটে একটি ছদ্মনাম গ্রহণ করেন—আজিজ মেহের। পরবর্তীতে চলচ্চিত্র ও সাহিত্যজগতে এই নামেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন; সময়ের প্রবাহে তাঁর আসল নামটি প্রায় হারিয়েই যায়।

 

রাজনীতি ও সাংবাদিকতার পাশাপাশি স্টিল ফটোগ্রাফিতে তাঁর ছিল অসাধারণ পারদর্শিতা। সেখান থেকেই চলচ্চিত্রজগতে তাঁর যাত্রা। এ জে কারদারের ‘দূর হ্যায় সুখ কা গাঁও’ চলচ্চিত্রে ব্যবস্থাপনা সহকারী হিসেবে প্রথম কাজ করেন তিনি। পরে ‘এই তো জীবন’ ছবির প্রযোজনা ব্যবস্থাপক এবং আলমগীর কবিরের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ধীরে বহে মেঘনা’–এর প্রধান সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

 

চিত্রপরিচালক হিসেবে আজিজ মেহেরের প্রথম কাজ ‘আওর গম নেহী’ (ইবনে মিজানের সঙ্গে যৌথভাবে), যদিও ছবিটি মুক্তি পায়নি। পরবর্তীতে দুই ভাই যৌথভাবে ‘একালের রূপকথা’ নির্মাণ করেন, যা ১৯৬৫ সালে মুক্তি পায়। তাঁর একক পরিচালনায় নির্মিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো ‘বিচার’ ও ‘আকাশ পরী’।

 

পরিচালনার পাশাপাশি তিনি অভিনয়, কাহিনি ও সংলাপ রচনাতেও সক্রিয় ছিলেন। ‘ধীরে বহে মেঘনা’, ‘রূপালী সৈকতে’, ‘পরিণীতা’ সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ‘জংলী মেয়ে’ ও ‘পাতালপুরীর রাজকন্যা’ ছবির কাহিনি ও সংলাপও তাঁরই লেখা।

 

লেখক হিসেবে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘স্মৃতি শুধু স্মৃতি নয়’, ‘নিষিদ্ধ কথকথা’, ‘আনন্দের ডায়েরি’, ‘ইনোনি শকুন্তলার ভালোবাসা’ প্রভৃতি। তিনি ‘বস্তু প্রকাশন’ নামে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যেখান থেকে বহু বিশিষ্ট লেখকের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

 

রাজনৈতিক জীবনে আজিজ মেহের ছিলেন একনিষ্ঠ ও সংগ্রামী। সাবেক নকশাল নেতা হিসেবে তিনি পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল, দেবেন শিকদার)-এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সারাজীবন কৃষক আন্দোলন, মওলানা ভাষানীর সঙ্গে কাগমারী সম্মেলন, সন্তোষের মহাসমাবেশে সক্রিয় ভূমিকা এবং পাকিস্তান ও পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কারণে একাধিকবার কারাবরণ করেন।

 

বাম রাজনীতির আদর্শে অনুপ্রাণিত হলেও আজিজ মেহের ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী—একজন মানবিক, সদালাপী, সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ। লেখক-প্রকাশক, সাংবাদিক-চিত্রপরিচালক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে তাঁর অবদান বাংলা সংস্কৃতিতে গভীরভাবে স্মরণীয়।

 

২০১৭ সালের ১০ আগস্ট ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে এই গুণী মানুষের স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা এবং তাঁর বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।

 

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট