তাড়াশে এখনও বিদ্যমান ঐতিহাসিক বেহুলার কূপ—কালের সাক্ষী এক লোকগাঁথার স্মৃতি
- আপডেট সময় : ০৫:০২:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১৪৩৯ বার পড়া হয়েছে
ষোলশ শতাব্দীর প্রাচীন ও বিশ্বনন্দিত লোককাহিনীর সতী-সাবিত্রী নায়িকা বেহুলা সুন্দরীর স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন আজও টিকে আছে চলনবিল অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায়। ইতিহাস ও জনশ্রুতি মতে, বেহুলা সুন্দরীর জন্মস্থান ছিল তৎকালীন নিচানীনগর, বর্তমান বারুহাস ইউনিয়নের বিনসাড়া গ্রাম। তিনি ছিলেন বাছোবানিয়ার একমাত্র রূপসী কন্যা—রূপে ও গুণে অনন্য।
এককালে চলনবিল জনপদের বিভিন্ন এলাকায় রাজা-জমিদারদের বসতি ছিল। আজও তাড়াশজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সেই অতীতের বহু পুরাকীর্তির নিদর্শন। বেহুলার বাড়ি ও ঐতিহাসিক জিয়নকূপ এখনও ইতিহাসের জীবন্ত স্মৃতি বহন করে চলেছে। বিনসাড়া গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় আজও দেখা যায় অসংখ্য পুরনো মন্দির, দালানকোঠা ও স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ।
আরো পড়ুন: বেহুলার স্মৃতি ঘেরা তাড়াশ হতে পারে ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র
রূপ-গুণের অধিকারিণী বেহুলা সুন্দরী প্রায়ই তাঁর বাবা বাছোবানিয়ার সঙ্গে বাজারে যেতেন। যে বাজারে তিনি যেতেন, সেটির নাম ছিল চান্দেরবাজার। প্রায় ৩০০ বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত এই ঐতিহাসিক বাজারটি তাড়াশের বস্তুল গ্রাম এলাকায় অবস্থিত। জনশ্রুতি আছে—এই বাজার এলাকার এক বিশাল বটগাছের নিচে বসেই বেহুলা ও লখিন্দর গল্প করতেন। সেই বটগাছটি আজও বিশাল এলাকাজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে, কালের সাক্ষী হয়ে।
বর্তমানে চান্দেরবাজার-সংলগ্ন বস্তুল গ্রামে স্কুল, কলেজ, ভূমি অফিস ও হাটবাজার গড়ে উঠেছে। তাড়াশ উপজেলার এই এলাকাতেই রয়েছে প্রায় ৭০০ বিঘা খাস জমি। দুঃখজনকভাবে, একশ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি এসব খাস জমির বড় একটি অংশ দখল করে নিয়েছে। কোথাও জাল কাগজপত্র তৈরি করে, আবার কোথাও দালানকোঠা নির্মাণ করে বসবাস করছে তারা। কিছু জমিতে আশ্রয়ণ কেন্দ্র তৈরি হলেও অধিকাংশ জমি এখনও অবৈধ দখলে রয়েছে। অথচ সরকারিভাবে এসব খাস জমি লিজ দেওয়া হলে প্রতিবছর লাখ লাখ টাকা রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা পড়তে পারত।
ইতিহাস বলে, একসময় বিনসাড়া ছিল জমিদারদের সমৃদ্ধ এক নগর। এখানে ছিল বিশাল অট্টালিকা ও দালান। আজও মাটি খনন করলে সেসব স্থাপনার নিদর্শন পাওয়া যায়। এই গ্রামেই অবস্থিত সতী বেহুলার বাড়ি ও বিখ্যাত বেহুলার কূপ। কূপটির বিশেষত্ব হলো—এর ভেতরে রয়েছে আরও চারটি ছোট কূপ, যা দর্শনার্থীদের গভীরভাবে আকর্ষণ করে।
এই কূপকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা ও বিস্ময়কর জনশ্রুতি। শোনা যায়, একসময় রোগ-বালাই থেকে মুক্তির নিয়তে এ কূপের পানি পান করলে আরোগ্য লাভ হতো। আরও একটি আশ্চর্য বিশ্বাস প্রচলিত আছে—তৎকালীন সময়ে কোনো অনুষ্ঠানের জন্য থালা-বাসন, বাটি, জগ, পাতিলসহ প্রয়োজনীয় জিনিস কূপের কাছে গিয়ে চাইলে তা নাকি নিজে থেকেই উঠে আসত।
কথিত আছে, একদিন কোনো অসাধু ব্যক্তি ব্যবহার শেষে এসব বাসনপত্র ফেরত না দেওয়ায়, কূপটি তার সেই ‘ডেকোরেটরসুলভ’ আচরণ বন্ধ করে দেয়। লোকমুখে প্রচলিত এসব কাহিনীর আড়ালেও এখানে রয়েছে বিপুল পুরাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সম্পদ, যা রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা একান্ত প্রয়োজন।
আরো পড়ুন: হুরাসাগরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাস — মাটি বেহাল এক রহস্যময় কূপ
কিভাবে যাবেন
তাড়াশ বাজার থেকে রিকশা, ভ্যান বা মোটরসাইকেলে সহজেই বিনসাড়া গ্রামে গিয়ে বেহুলার কূপ ও স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো দেখা যায়।
দর্শনীয় স্থান
- বারুহাস ইউনিয়নের বিনসাড়া গ্রামে আজও দেখা যায়—
- বেহুলার বাড়ি
- ঐতিহাসিক বেহুলার কূপ (জিয়নকূপ)
- বেহুলার জীবনাবসানের সঙ্গে জড়িত নৌকার স্মৃতি
অবস্থান
বারুহাস ইউনিয়ন, বিনসাড়া গ্রাম, তাড়াশ উপজেলা, সিরাজগঞ্জ
ইতিহাস, লোকগাঁথা আর বিশ্বাসের মেলবন্ধনে গড়া বেহুলার কূপ আজও জানিয়ে দেয়—তাড়াশ কেবল একটি জনপদ নয়, এটি বাংলার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক জীবন্ত ভাণ্ডার।














