আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চার অগ্রদূত

রেজওয়ান
  • আপডেট সময় : ০৪:১১:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ১১৩৭ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সিরাজগঞ্জ এর সর্বশেষ ও জনপ্রিয় লেখা অনুসরণ করতে গুগল নিউজফিড দেখুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন (১৯৩০–১৯৯৮) ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক, শিক্ষাবিদ ও দক্ষ প্রশাসক। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ, বোধগম্য ও আকর্ষণীয় করে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তার অবদান ইতিহাসে অনন্য। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মাঝে বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তুলতে তিনি ছিলেন এক পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব।

 

১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি সিরাজগঞ্জ জেলার ফুলবাড়ি গ্রামে তার জন্ম। শৈশব থেকেই মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দেন তিনি। উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৯৫৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর উচ্চতর জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে শিক্ষা বিষয়ে এমএ ও ১৯৬২ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

 

আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিনের কর্মজীবনের সূচনা হয় একজন সরকারি কলেজ শিক্ষক হিসেবে। পরবর্তীকালে তার যোগ্যতা ও দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শিক্ষক-প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, জনশিক্ষা পরিচালক (ডিপিআই), বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব এবং সর্বশেষ সচিব হিসেবে কাজ করেন। সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পরও তিনি থেমে থাকেননি; এডিবি–ইউএনডিপি অর্থায়নকৃত মাধ্যমিক বিজ্ঞান শিক্ষা প্রকল্পের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

সুরের জাদুকর সিরাজগঞ্জের সন্তান আলম খান

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে আল-মুতী শরফুদ্দিনের অবদান অপরিসীম। তিনি বিশ্বাস করতেন, মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষা ছাড়া জাতির প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যেই তিনি শিশু-কিশোর ও সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজ ভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেন। বিজ্ঞান, পরিবেশ ও শিক্ষা বিষয়ক তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৮টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— বিজ্ঞান ও মানুষ, এ যুগের বিজ্ঞান, বিপন্ন পরিবেশ, বিজ্ঞান-জিজ্ঞাসা, সাগরের রহস্যপুরী, মেঘ বৃষ্টি রোদ এবং পরিবেশের সংকট ঘনিয়ে আসছে।

 

বিজ্ঞান শিক্ষা ও সাহিত্য ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশি-বিদেশি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। এর মধ্যে রয়েছে— বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, একুশে পদক, শিশু একাডেমী পুরস্কার, ইউনেস্কোর কলিঙ্গ পুরস্কার এবং ড. কুদরত-ই-খুদা স্বর্ণপদকসহ এক ডজনেরও বেশি সম্মাননা।

 

সম্পাদনা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সক্রিয়। তিনি বাংলা একাডেমী প্রকাশিত ‘বিজ্ঞান বিশ্বকোষ’-এর প্রধান সম্পাদক ছিলেন এবং শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘মুকুল’-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মময় জীবনের পাশাপাশি তিনি সাহিত্য সংসদ, প্রগতি লেখক সংঘ, কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলা, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, বিজ্ঞান সংস্কৃতি পরিষদ এবং Human Development Foundationসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার অবস্থান ছিল সুদৃঢ়। তিনি ইসলামিক একাডেমী অব সাইন্স-এর প্রতিষ্ঠাতা ফেলো, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির ফেলো এবং সভাপতি (১৯৮৮–১৯৯১) ছিলেন। এছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমীর সভাপতি (১৯৮৬–১৯৯০), Bangladesh Association for Science Education-এর সভাপতি (১৯৮৮–১৯৯৫), International Council of Associations for Science Education-এর নির্বাহী সদস্য (১৯৮৯–১৯৯৩) এবং ইউনেস্কোর মহাপরিচালক মনোনীত International Scientific Council-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ভৌতিক জয়সাগর

১৯৯৮ সালের ৩০ নভেম্বর ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির National Encyclopedia of Bangladesh Project-এর Project Implementation Committee-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

 

আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন ছিলেন এমন এক আলোকিত মানুষ, যিনি বিজ্ঞানকে কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ করে তুলেছিলেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

লেখাটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চার অগ্রদূত

আপডেট সময় : ০৪:১১:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫

আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন (১৯৩০–১৯৯৮) ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক, শিক্ষাবিদ ও দক্ষ প্রশাসক। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ, বোধগম্য ও আকর্ষণীয় করে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তার অবদান ইতিহাসে অনন্য। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মাঝে বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তুলতে তিনি ছিলেন এক পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব।

 

১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি সিরাজগঞ্জ জেলার ফুলবাড়ি গ্রামে তার জন্ম। শৈশব থেকেই মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দেন তিনি। উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৯৫৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর উচ্চতর জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে শিক্ষা বিষয়ে এমএ ও ১৯৬২ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

 

আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিনের কর্মজীবনের সূচনা হয় একজন সরকারি কলেজ শিক্ষক হিসেবে। পরবর্তীকালে তার যোগ্যতা ও দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শিক্ষক-প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, জনশিক্ষা পরিচালক (ডিপিআই), বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব এবং সর্বশেষ সচিব হিসেবে কাজ করেন। সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পরও তিনি থেমে থাকেননি; এডিবি–ইউএনডিপি অর্থায়নকৃত মাধ্যমিক বিজ্ঞান শিক্ষা প্রকল্পের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

সুরের জাদুকর সিরাজগঞ্জের সন্তান আলম খান

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে আল-মুতী শরফুদ্দিনের অবদান অপরিসীম। তিনি বিশ্বাস করতেন, মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষা ছাড়া জাতির প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যেই তিনি শিশু-কিশোর ও সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজ ভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেন। বিজ্ঞান, পরিবেশ ও শিক্ষা বিষয়ক তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৮টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— বিজ্ঞান ও মানুষ, এ যুগের বিজ্ঞান, বিপন্ন পরিবেশ, বিজ্ঞান-জিজ্ঞাসা, সাগরের রহস্যপুরী, মেঘ বৃষ্টি রোদ এবং পরিবেশের সংকট ঘনিয়ে আসছে।

 

বিজ্ঞান শিক্ষা ও সাহিত্য ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশি-বিদেশি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। এর মধ্যে রয়েছে— বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, একুশে পদক, শিশু একাডেমী পুরস্কার, ইউনেস্কোর কলিঙ্গ পুরস্কার এবং ড. কুদরত-ই-খুদা স্বর্ণপদকসহ এক ডজনেরও বেশি সম্মাননা।

 

সম্পাদনা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সক্রিয়। তিনি বাংলা একাডেমী প্রকাশিত ‘বিজ্ঞান বিশ্বকোষ’-এর প্রধান সম্পাদক ছিলেন এবং শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘মুকুল’-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মময় জীবনের পাশাপাশি তিনি সাহিত্য সংসদ, প্রগতি লেখক সংঘ, কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলা, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, বিজ্ঞান সংস্কৃতি পরিষদ এবং Human Development Foundationসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার অবস্থান ছিল সুদৃঢ়। তিনি ইসলামিক একাডেমী অব সাইন্স-এর প্রতিষ্ঠাতা ফেলো, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির ফেলো এবং সভাপতি (১৯৮৮–১৯৯১) ছিলেন। এছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমীর সভাপতি (১৯৮৬–১৯৯০), Bangladesh Association for Science Education-এর সভাপতি (১৯৮৮–১৯৯৫), International Council of Associations for Science Education-এর নির্বাহী সদস্য (১৯৮৯–১৯৯৩) এবং ইউনেস্কোর মহাপরিচালক মনোনীত International Scientific Council-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ভৌতিক জয়সাগর

১৯৯৮ সালের ৩০ নভেম্বর ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির National Encyclopedia of Bangladesh Project-এর Project Implementation Committee-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

 

আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন ছিলেন এমন এক আলোকিত মানুষ, যিনি বিজ্ঞানকে কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ করে তুলেছিলেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।