সুরের জাদুকর সিরাজগঞ্জের সন্তান আলম খান
- আপডেট সময় : ০৩:৫১:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ৬৬০ বার পড়া হয়েছে
বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে যে ক’জন সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক নিজেদের সৃষ্টির গুণে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন, তাদের মধ্যে আলম খান এক উজ্জ্বল নাম। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তার সুরে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য কালজয়ী গান। সুরের মাধুর্য, গভীরতা ও বৈচিত্র্যের কারণে শ্রোতারা তাকে ভালোবেসে ডাকেন— সুরের জাদুকর।
১৯৪৪ সালের ২২ অক্টোবর সিরাজগঞ্জ জেলার বানিয়াগাতি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আলম খান। তার বাবা ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং মা নবাব সিরাজউদ্দৌলার দরবারের এক শিল্পীর বংশধর। বাবার চাকরির কারণে শৈশবেই তাকে কলকাতায় যেতে হয়। তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবারসহ আবার ফিরে আসেন স্বদেশে।
ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন আলম খান। স্কুলজীবনেই সঙ্গীতের প্রতি তার গভীর অনুরাগ জন্ম নেয়। মায়ের অনুপ্রেরণায় গানের চর্চা শুরু হলেও পরবর্তীতে বাবাও তাকে পূর্ণ সমর্থন দেন। উল্লেখ্য, তার ছোট ভাই বাংলাদেশের কিংবদন্তি পপসম্রাট আজম খান।
১৯৬৩ সালে সঙ্গীত জগতে আলম খানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। খ্যাতিমান সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক রবিন ঘোষের সহকারী হিসেবে তিনি ‘তালাশ’ সিনেমার সঙ্গীত পরিচালনায় কাজ করেন। এরপর টানা সাত বছর সহকারী হিসেবেই সঙ্গীত জগতে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন।
১৯৭০ সালে ‘কাচ কাটা হীরে’ সিনেমার মাধ্যমে একক সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও শুরুতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য ধরা দেয়নি। জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছাতে তাকে অপেক্ষা করতে হয় আরও আট বছর। অবশেষে ১৯৭৮ সালে আবদুল্লাহ আল মামুন পরিচালিত ‘সারেং বৌ’ চলচ্চিত্রের ‘ও রে নীল দরিয়া’ গানটি তাকে এনে দেয় দেশব্যাপী খ্যাতি। গানটি অল্প সময়েই জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে বাংলা গানের ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নেয়।
এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি আলম খানকে। একের পর এক কালজয়ী সুর সৃষ্টি করে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সঙ্গীত ভাণ্ডার। তার সুরে গান গেয়ে অসংখ্য শিল্পী পেয়েছেন আকাশসম জনপ্রিয়তা।
তার সুর করা উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে রয়েছে— ও রে নীল দরিয়া, হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস দম ফুরাইলে ঠুস, আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো গন্ধ বিলিয়ে যাই, ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে, কি জাদু করিলা পিরিতি শিখাইলা, তুমি যেখানে আমি সেখানে, সবাই তো ভালোবাসা চায়, চাঁদের সাথে আমি দেবো না তোমার তুলনা, তুমি কি এখন আমারই কথা ভাবছো, আকাশেতে লক্ষ তারা চাঁদ কিন্তু একটাইরে—সহ আরও অসংখ্য জনপ্রিয় গান।
কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ আলম খান ছয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচবার শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক এবং একবার শ্রেষ্ঠ সুরকার হিসেবে সম্মাননা লাভ করেন। পাশাপাশি তিনি বাচসাস পুরস্কারও অর্জন করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৭৬ সালে তিনি গীতিকার হাবিবুননেসা গুলবানুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। গুলবানুর লেখা ‘তুমি তো এখন আমারই কথা ভাবছো’ গানটি আলম খানের সুরে সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। তাদের সংসারে দুই ছেলে— আরমান খান ও আদনান খান, দুজনই সঙ্গীত পরিচালক; এবং একমাত্র কন্যা আনিকা খান।
সুর, সাধনা ও সৃষ্টিশীলতার অনন্য মেলবন্ধনে আলম খান আজও বাংলা সঙ্গীতের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়— সিরাজগঞ্জের গর্ব, বাংলার সুরের জাদুকর।














