আমাদের একজন ভাষা সৈনিক ছিলেন, যিনি ভাষা ও মানুষের সেবাকেই জীবন হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন

ভাষা আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক ও জনদরদি চিকিৎসক ডা. আলী আজমল বুলবুল : মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা

রেজওয়ান
  • আপডেট সময় : ০৪:৫১:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ৪৯৪ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সিরাজগঞ্জ এর সর্বশেষ ও জনপ্রিয় লেখা অনুসরণ করতে গুগল নিউজফিড দেখুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের জনদরদি ভাষা সৈনিক ডা. আলী আজমল বুলবুল–এর আজ মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে আমরা তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এক মহান মানুষকে, যিনি জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে মায়ের ভাষা ও মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।

 

১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের এক অগ্রগণ্য লড়াকু সৈনিক ছিলেন ডা. আলী আজমল বুলবুল। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা ভেঙে রাজপথে নেমে যাঁরা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, তাঁদের প্রথম দশজনের একজন ছিলেন তিনি।

 

ডা. আলী আজমল জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার পাড়কোলা গ্রামে, এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর পিতা মুহাম্মদ সোলায়মান এবং মাতা জোবেদা খাতুন। পিতার কর্মসূত্রে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা রাজশাহীতে। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন তিনি। উভয় পরীক্ষাতেই তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সম্মিলিত মেধা তালিকায় যথাক্রমে ১৩তম ও ১১তম স্থান অধিকার করে তিনি অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন।

 

পরবর্তীতে মেধাতালিকায় স্থান পেয়ে ভর্তি হন কলকাতা মেডিকেল কলেজে। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে মাইগ্রেশন সার্টিফিকেট নিয়ে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্থানান্তরিত হন। মেধার পাশাপাশি নেতৃত্বগুণে তিনি ছিলেন অনন্য। ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

 

১৯৪৮ সাল থেকেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র সমাজ যখন ফুঁসে উঠছিল, তখন থেকেই শুরু হয় তাঁর সংগ্রামী জীবন। সে বছর হরতাল চলাকালে ঢাকা সেক্রেটারিয়েট ভবন ও ২ নম্বর গেটে পিকেটিং করার সময় প্রথমবার গ্রেপ্তার হন তিনি। এরপর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ১১ বার কারাবরণ করেন এবং ১৭ বার পুলিশের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকাভুক্ত হন। এসব ঘটনার পরিণতিতে কর্তৃপক্ষ তাঁকে মেডিকেল কলেজ থেকে বহিষ্কার করে। ফলে তাঁর এমবিবিএস ডিগ্রি সম্পন্ন করা আর সম্ভব হয়নি।

 

১৯৫৪ সালে তিনি নিজ গ্রাম শাহজাদপুরে ফিরে আসেন এবং উপজেলা সদরের মণিরামপুরে পিতার ক্রয়কৃত একটি সাধারণ টিনের ঘরে চিকিৎসাসেবা শুরু করেন। আজীবন তিনি সেখানেই নামমাত্র ফি নিয়ে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের চিকিৎসা করে গেছেন। সর্বসাধারণের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন “বুলবুল ডাক্তার” নামে। ইচ্ছা করলে চিকিৎসা পেশায় বিপুল অর্থবিত্ত অর্জন করতে পারতেন, কিন্তু তিনি চিকিৎসাকে নিয়েছিলেন মানবসেবার ব্রত হিসেবে—আয়–উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়। জীবনযাপনেও ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে ও বিনয়ী।

 

স্বাধীনতার পর ভাষা আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই ডিগ্রি লাভের সুযোগ পেলেও ডা. আলী আজমল আর কখনো ডিগ্রির পেছনে ছোটেননি। তিনি তাঁর চারপাশের মানুষ আর রোগীদের পাশেই থেকে যেতে চেয়েছিলেন।

 

ডা. আলী আজমল ছিলেন একজন গভীর জ্ঞানপিপাসু মানুষ। বাংলা-ইংরেজি সাহিত্য, গণিত, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল বিস্ময়কর। দেশ ও দেশের মানুষই ছিল তাঁর জীবনের মূল চেতনা। ছাত্রজীবন থেকে আমৃত্যু মানুষের অধিকার ও ন্যায্য দাবির পক্ষে তিনি ছিলেন সোচ্চার।

 

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি কিছুটা নিস্তব্ধ হয়ে পড়েন। শ্বাসকষ্টসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগে ২০০২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে পাঁচ দিন অচেতন থাকার পর ৩ অক্টোবর তিনি ইন্তেকাল করেন। শাহজাদপুরবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে তাঁকে হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহ.)–এর মসজিদ ও মাজার সংলগ্ন দক্ষিণ পাশের কবরস্থানে দাফন করা হয়। প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি যথাযোগ্য মর্যাদায় তাঁর কবরে পুষ্পার্পণ ও দোয়ার আয়োজন করা হয়।

 

তিন ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। তাঁর সন্তানরাও শিক্ষা, আইন ও চিকিৎসা পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে সমাজে আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন—যা তাঁর আদর্শেরই প্রতিফলন।

 

ডা. আলী আজমল বুলবুল ছিলেন ভাষা আন্দোলনের জীবন্ত ইতিহাস, মানুষের চিকিৎসক ও মানবতার প্রতীক।

আমরা তোমাকে ভুলব না—চিরদিন শ্রদ্ধায় স্মরণ করব।

লেখাটি শেয়ার করুন

আমাদের একজন ভাষা সৈনিক ছিলেন, যিনি ভাষা ও মানুষের সেবাকেই জীবন হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন

ভাষা আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক ও জনদরদি চিকিৎসক ডা. আলী আজমল বুলবুল : মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা

আপডেট সময় : ০৪:৫১:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৫

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের জনদরদি ভাষা সৈনিক ডা. আলী আজমল বুলবুল–এর আজ মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে আমরা তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এক মহান মানুষকে, যিনি জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে মায়ের ভাষা ও মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।

 

১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের এক অগ্রগণ্য লড়াকু সৈনিক ছিলেন ডা. আলী আজমল বুলবুল। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা ভেঙে রাজপথে নেমে যাঁরা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, তাঁদের প্রথম দশজনের একজন ছিলেন তিনি।

 

ডা. আলী আজমল জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার পাড়কোলা গ্রামে, এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর পিতা মুহাম্মদ সোলায়মান এবং মাতা জোবেদা খাতুন। পিতার কর্মসূত্রে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা রাজশাহীতে। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন তিনি। উভয় পরীক্ষাতেই তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সম্মিলিত মেধা তালিকায় যথাক্রমে ১৩তম ও ১১তম স্থান অধিকার করে তিনি অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন।

 

পরবর্তীতে মেধাতালিকায় স্থান পেয়ে ভর্তি হন কলকাতা মেডিকেল কলেজে। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে মাইগ্রেশন সার্টিফিকেট নিয়ে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্থানান্তরিত হন। মেধার পাশাপাশি নেতৃত্বগুণে তিনি ছিলেন অনন্য। ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

 

১৯৪৮ সাল থেকেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র সমাজ যখন ফুঁসে উঠছিল, তখন থেকেই শুরু হয় তাঁর সংগ্রামী জীবন। সে বছর হরতাল চলাকালে ঢাকা সেক্রেটারিয়েট ভবন ও ২ নম্বর গেটে পিকেটিং করার সময় প্রথমবার গ্রেপ্তার হন তিনি। এরপর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ১১ বার কারাবরণ করেন এবং ১৭ বার পুলিশের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকাভুক্ত হন। এসব ঘটনার পরিণতিতে কর্তৃপক্ষ তাঁকে মেডিকেল কলেজ থেকে বহিষ্কার করে। ফলে তাঁর এমবিবিএস ডিগ্রি সম্পন্ন করা আর সম্ভব হয়নি।

 

১৯৫৪ সালে তিনি নিজ গ্রাম শাহজাদপুরে ফিরে আসেন এবং উপজেলা সদরের মণিরামপুরে পিতার ক্রয়কৃত একটি সাধারণ টিনের ঘরে চিকিৎসাসেবা শুরু করেন। আজীবন তিনি সেখানেই নামমাত্র ফি নিয়ে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের চিকিৎসা করে গেছেন। সর্বসাধারণের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন “বুলবুল ডাক্তার” নামে। ইচ্ছা করলে চিকিৎসা পেশায় বিপুল অর্থবিত্ত অর্জন করতে পারতেন, কিন্তু তিনি চিকিৎসাকে নিয়েছিলেন মানবসেবার ব্রত হিসেবে—আয়–উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়। জীবনযাপনেও ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে ও বিনয়ী।

 

স্বাধীনতার পর ভাষা আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই ডিগ্রি লাভের সুযোগ পেলেও ডা. আলী আজমল আর কখনো ডিগ্রির পেছনে ছোটেননি। তিনি তাঁর চারপাশের মানুষ আর রোগীদের পাশেই থেকে যেতে চেয়েছিলেন।

 

ডা. আলী আজমল ছিলেন একজন গভীর জ্ঞানপিপাসু মানুষ। বাংলা-ইংরেজি সাহিত্য, গণিত, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল বিস্ময়কর। দেশ ও দেশের মানুষই ছিল তাঁর জীবনের মূল চেতনা। ছাত্রজীবন থেকে আমৃত্যু মানুষের অধিকার ও ন্যায্য দাবির পক্ষে তিনি ছিলেন সোচ্চার।

 

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি কিছুটা নিস্তব্ধ হয়ে পড়েন। শ্বাসকষ্টসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগে ২০০২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে পাঁচ দিন অচেতন থাকার পর ৩ অক্টোবর তিনি ইন্তেকাল করেন। শাহজাদপুরবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে তাঁকে হযরত মখদুম শাহদৌলা শহীদ ইয়ামেনী (রহ.)–এর মসজিদ ও মাজার সংলগ্ন দক্ষিণ পাশের কবরস্থানে দাফন করা হয়। প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি যথাযোগ্য মর্যাদায় তাঁর কবরে পুষ্পার্পণ ও দোয়ার আয়োজন করা হয়।

 

তিন ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। তাঁর সন্তানরাও শিক্ষা, আইন ও চিকিৎসা পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে সমাজে আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন—যা তাঁর আদর্শেরই প্রতিফলন।

 

ডা. আলী আজমল বুলবুল ছিলেন ভাষা আন্দোলনের জীবন্ত ইতিহাস, মানুষের চিকিৎসক ও মানবতার প্রতীক।

আমরা তোমাকে ভুলব না—চিরদিন শ্রদ্ধায় স্মরণ করব।