সিরাজগঞ্জের গর্ব প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম : মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

রেজওয়ান
  • আপডেট সময় : ০৪:৪৩:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫
  • / ৭০৯ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সিরাজগঞ্জ এর সর্বশেষ ও জনপ্রিয় লেখা অনুসরণ করতে গুগল নিউজফিড দেখুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বরেণ্য শিক্ষাবিদ, কবি, গবেষক, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফোকলোর বিশারদ, সংস্কৃতিকর্মী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক—সিরাজগঞ্জের কৃতী সন্তান প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম-এর আজ মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে জাতি স্মরণ করছে এমন এক মানুষকে, যাঁর জীবন ও কর্ম বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং স্বাধীনতার ইতিহাসে গভীরভাবে উৎকীর্ণ।

 

ড. মযহারুল ইসলামের জন্ম ১৯২৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, বৃহত্তর পাবনা জেলার (বর্তমান সিরাজগঞ্জ) চরনবীপুর গ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন ডা. মোহাম্মদ আলী। শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। ১৯৪৫ সালে তালগাছী আবু ইসহাক উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক, ১৯৪৭ সালে সিরাজগঞ্জ কলেজ থেকে আইএ কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন। এরপর রাজশাহী সরকারি কলেজে বাংলা বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হয়ে ১৯৪৯ সালে অনার্স পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫০ সালে এমএ প্রিভিয়াস এবং ১৯৫১ সালে এমএ ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে তিনি গোল্ড মেডাল ও কালীনারায়ণ স্কলারশিপ অর্জন করেন—যা তাঁর মেধার উজ্জ্বল প্রমাণ।

 

১৯৫২ সালে ঢাকা কলেজে বাংলা বিভাগের লেকচারার হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র লেকচারার এবং ১৯৫৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৫৮ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ১৯৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় পিএইচডি অর্জন করেন। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বার্কলে)–তে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে অধ্যাপনার মাধ্যমে তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতি বিস্তৃত হয়।

 

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনের সময় থেকেই ড. মযহারুল ইসলাম সক্রিয়ভাবে স্বাধীনতার পক্ষে ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন—কখনো অস্ত্র হাতে, কখনো কলমের শক্তিতে। বেড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। জীবন বিপন্ন হওয়ায় পরে পায়ে হেঁটে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন।

 

রাষ্ট্র ও সংস্কৃতিতে অবদান

 

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক নিযুক্ত হন (১৯৭২–১৯৭৪)। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা একাডেমি দেশের প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রূপ লাভ করে। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন। ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে তাঁকে কারাবরণ করতে হয় এবং দীর্ঘ তিন বছর কারাগারে থাকেন। পরবর্তীতে ভারতে দীর্ঘদিন ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে অধ্যাপনা করেন।

 

সাহিত্য ও গবেষণা

 

কিশোর বয়স থেকেই কবিতা লেখায় হাতেখড়ি। করতোয়া নদী, প্রকৃতি, মাটি ও মানুষের নিবিড় সম্পর্ক তাঁর সাহিত্যের প্রধান অনুষঙ্গ। তাঁর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা দশের বেশি এবং গবেষণা ও প্রবন্ধগ্রন্থ ২৫টিরও অধিক। ফোকলোর গবেষণায় তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। বাংলাদেশ ফোকলোর সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিও ছিলেন তিনি।

 

বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৮) ও দাউদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭০) সহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হন।

 

শেষ অধ্যায়

 

চিকিৎসাজনিত কারণে ২০০৩ সালের ১৫ নভেম্বর ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী শাহজাদপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। হাজার হাজার মানুষ তাঁর শেষ বিদায়ে অংশ নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

 

প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম মানুষকে হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছিলেন—এবং আজও তিনি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন তাঁর কর্ম, সাহিত্য ও আদর্শের মাধ্যমে।

এই মহীরুহ ব্যক্তিত্বের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও চিরস্মরণীয় সম্মান।

লেখাটি শেয়ার করুন

সিরাজগঞ্জের গর্ব প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম : মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

আপডেট সময় : ০৪:৪৩:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫

বরেণ্য শিক্ষাবিদ, কবি, গবেষক, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফোকলোর বিশারদ, সংস্কৃতিকর্মী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক—সিরাজগঞ্জের কৃতী সন্তান প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম-এর আজ মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে জাতি স্মরণ করছে এমন এক মানুষকে, যাঁর জীবন ও কর্ম বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং স্বাধীনতার ইতিহাসে গভীরভাবে উৎকীর্ণ।

 

ড. মযহারুল ইসলামের জন্ম ১৯২৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, বৃহত্তর পাবনা জেলার (বর্তমান সিরাজগঞ্জ) চরনবীপুর গ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন ডা. মোহাম্মদ আলী। শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। ১৯৪৫ সালে তালগাছী আবু ইসহাক উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক, ১৯৪৭ সালে সিরাজগঞ্জ কলেজ থেকে আইএ কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন। এরপর রাজশাহী সরকারি কলেজে বাংলা বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হয়ে ১৯৪৯ সালে অনার্স পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫০ সালে এমএ প্রিভিয়াস এবং ১৯৫১ সালে এমএ ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে তিনি গোল্ড মেডাল ও কালীনারায়ণ স্কলারশিপ অর্জন করেন—যা তাঁর মেধার উজ্জ্বল প্রমাণ।

 

১৯৫২ সালে ঢাকা কলেজে বাংলা বিভাগের লেকচারার হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র লেকচারার এবং ১৯৫৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৫৮ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ১৯৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় পিএইচডি অর্জন করেন। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বার্কলে)–তে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে অধ্যাপনার মাধ্যমে তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতি বিস্তৃত হয়।

 

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনের সময় থেকেই ড. মযহারুল ইসলাম সক্রিয়ভাবে স্বাধীনতার পক্ষে ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন—কখনো অস্ত্র হাতে, কখনো কলমের শক্তিতে। বেড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। জীবন বিপন্ন হওয়ায় পরে পায়ে হেঁটে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন।

 

রাষ্ট্র ও সংস্কৃতিতে অবদান

 

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক নিযুক্ত হন (১৯৭২–১৯৭৪)। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা একাডেমি দেশের প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রূপ লাভ করে। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন। ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে তাঁকে কারাবরণ করতে হয় এবং দীর্ঘ তিন বছর কারাগারে থাকেন। পরবর্তীতে ভারতে দীর্ঘদিন ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে অধ্যাপনা করেন।

 

সাহিত্য ও গবেষণা

 

কিশোর বয়স থেকেই কবিতা লেখায় হাতেখড়ি। করতোয়া নদী, প্রকৃতি, মাটি ও মানুষের নিবিড় সম্পর্ক তাঁর সাহিত্যের প্রধান অনুষঙ্গ। তাঁর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা দশের বেশি এবং গবেষণা ও প্রবন্ধগ্রন্থ ২৫টিরও অধিক। ফোকলোর গবেষণায় তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। বাংলাদেশ ফোকলোর সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিও ছিলেন তিনি।

 

বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৮) ও দাউদ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭০) সহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হন।

 

শেষ অধ্যায়

 

চিকিৎসাজনিত কারণে ২০০৩ সালের ১৫ নভেম্বর ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী শাহজাদপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। হাজার হাজার মানুষ তাঁর শেষ বিদায়ে অংশ নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

 

প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম মানুষকে হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছিলেন—এবং আজও তিনি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন তাঁর কর্ম, সাহিত্য ও আদর্শের মাধ্যমে।

এই মহীরুহ ব্যক্তিত্বের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও চিরস্মরণীয় সম্মান।