চলনবিলের বুকে রহস্যে ঘেরা এক প্রাচীন দীঘি
ভৌতিক জয়সাগর
- আপডেট সময় : ০৫:১৯:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ৭৩৯ বার পড়া হয়েছে
সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের নিমগাছী ও গোতিথা মৌজার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ঐতিহাসিক জয়সাগর দীঘি। প্রায় ৫৮ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল দীঘিটি নিমগাছী বাজার থেকে পশ্চিম দিকে আনুমানিক ৫০০ মিটার দূরে অবস্থিত। ইতিহাস, জনশ্রুতি ও ভৌতিক কাহিনির মেলবন্ধনে জয়সাগর আজও চলনবিল অঞ্চলের এক বিস্ময়কর অধ্যায় হয়ে আছে।
ঐতিহাসিকদের মতে, পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজা গোপাল (সম্ভাব্য শাসনকাল আনুমানিক ৯৪০–৯৬০ খ্রিস্টাব্দ) অথবা পাল যুগের কোনো এক শাসকের আমলে এই দীঘিটি খনন করা হয়। লোককথা অনুসারে, প্রজাদের পানির কষ্ট নিবারণের উদ্দেশ্যেই এই বিশাল দীঘি খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
আরেকটি প্রচলিত কিংবদন্তি অনুযায়ী, একসময় রাজা জয়পাল চলনবিল অঞ্চলে রাজত্ব করতেন। তাঁর কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় তিনি গভীর মনঃকষ্টে ভুগছিলেন। একদিন এক সাধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে সেই সাধু রাজাকে বলেন—
রাজা যদি আধা মাইল দৈর্ঘ্যের একটি দীঘি খনন করেন, তবে বৃদ্ধ বয়সেও তিনি পুত্র লাভ করবেন। তবে শর্ত ছিল, রাজাকে আজীবন কুমার থাকতে হবে।
সাধুর কথামতো রাজা দীঘি খনন শুরু করান। পরের বছরই রাজার ঘরে এক পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। পুত্রের নাম রাখা হয় জয়কুমার। রাজা জয়পালের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন জয়কুমার। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তিনি সাধুর উপদেশ ভুলে একদিন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। জনশ্রুতি অনুযায়ী, সেই দিন থেকেই জয়সাগর দীঘির সমস্ত পানি হঠাৎ শুকিয়ে যায়।
ভুল বুঝতে পেরে জয়কুমার আবার সাধুর শরণাপন্ন হন। সাধু জানান, দীঘির মাঝখানে কোদাল দিয়ে একটি কোপ দিলে আবার সেখান থেকে পানি উঠে আসবে—তবে এতে প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে। প্রজাদের কল্যাণের কথা ভেবে জয়কুমার নিজের কোমরে লম্বা দড়ি বেঁধে সৈন্যদের হাতে ধরিয়ে দেন, যাতে কোনো বিপদ হলে তাঁকে টেনে তোলা যায়।
এরপর তিনি দীঘির মাঝখানে গিয়ে ভয়ভয়ে কোদাল দিয়ে জোরে কোপ দেন। সঙ্গে সঙ্গে মাটি ফেটে প্রবল জলধারা বেরিয়ে আসে। সৈন্যরা দড়ি ধরে টান দিয়েও তাকে আর তুলতে পারেনি—দড়ি খালি অবস্থাতেই ফিরে আসে। জয়কুমার চিরতরে দীঘির গর্ভে বিলীন হয়ে যান।
এরপর প্রজারা তাঁদের রাজপুত্রের নাম অনুসারেই দীঘিটির নাম রাখে “জয়সাগর”।
জনশ্রুতি আছে, জয়কুমারের মৃত্যুর কিছুদিন পর দীঘির মাঝখানে একটি বেলগাছ উদ্ভূত হয়। লোকেরা বিশ্বাস করত, ওই বেলগাছে জয়কুমারের প্রেতাত্মা বাস করে। ভয়ে কেউ সেই গাছের বেল খাওয়ার সাহস পেত না। পরবর্তীতে সেই বেলগাছটি আর স্থায়ীভাবে দেখা যায় না—লোকমুখে প্রচলিত আছে, গাছটি হঠাৎ আবির্ভূত হয়ে আবার অদৃশ্য হয়ে যায়।
আজও অনেক দর্শনার্থী দাবি করেন, নতুন কেউ জয়সাগরে বেড়াতে গেলে মাছে ভরা পানির মাঝে বা দীঘির পাড়ে ভাসমান বেল দেখতে পান। কিন্তু ধরতে গেলে সেটি পানির নিচে ডুবে যায়। এই রহস্য নিয়েই জয়সাগরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ভৌতিক বিশ্বাস।
১৯৪৭ সালের আগে জয়সাগরের চারপাশে ছিল ঘন জঙ্গল। কালের বিবর্তনে এখন সেই জঙ্গলের জায়গায় গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি। কয়েক বছর আগে গ্রামীণ মৎস্য ও পশুসম্পদ ফাউন্ডেশন উদ্যোগ নিয়ে দীঘিটি পরিষ্কার করে নিয়মিত মাছ চাষ শুরু করে। এতে জয়সাগর এখন আরও মনোমুগ্ধকর রূপ পেয়েছে।
সূর্যাস্তের সময় দীঘির জলে দেখা যায় রুই, কাতল, মৃগেলসহ নানা প্রজাতির মাছ এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে উঠে আবার ডুবে যাচ্ছে—দৃশ্যটি যেন প্রকৃতির লুকোচুরি খেলা। আশ্চর্যের বিষয়, আজ পর্যন্ত কেউ চেষ্টা করেও পুরোপুরি জয়সাগরের পানি সেঁচে শুকাতে পারেনি। তাই লোকমুখে এই দীঘি আজও পরিচিত “সাগর” নামেই।
চলনবিলের ইতিকথা, পাবনা জেলার গেজেটিয়ার ও ব্রিটিশ আমলের বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ায় জয়সাগর সম্পর্কিত এই কিংবদন্তির উল্লেখ পাওয়া যায় বলে জানা যায়।
অবস্থান
জয়সাগর দীঘি
- নিমগাছী বাজার সংলগ্ন,
- নিমগাছী, সোনাখাড়া ইউনিয়ন,
- রায়গঞ্জ উপজেলা, সিরাজগঞ্জ
ইতিহাস, কিংবদন্তি আর ভৌতিক রহস্যের আবরণে ঢাকা জয়সাগর আজও চলনবিলের বুকে এক নীরব বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।














